দেশের শেয়ারবাজার দীর্ঘদিন ধরেই নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তবে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান ও বাস্তবতা একে আরও উদ্বেগজনক পর্যায়ে নিয়ে গেছে। তালিকাভুক্ত কোম্পানির প্রায় ২৯ শতাংশ ‘জেড’ ক্যাটাগরিভুক্ত-যা কার্যত ঝুঁকিপূর্ণ বা অকার্যকর কোম্পানির প্রতীক। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশের উৎপাদন বন্ধ কিংবা অস্তিত্ব নিয়েই সংশয় রয়েছে। তবুও এসব কোম্পানির শেয়ার লেনদেন সচল থাকা এবং অনেক ক্ষেত্রে দরবৃদ্ধির শীর্ষে থাকা বাজারের কাঠামোগত দুর্বলতারই প্রমাণ। একটি সুস্থ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীরা মৌলভিত্তিক শক্তিশালী কোম্পানিতে আস্থা রাখেন। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, ভালো কোম্পানির সংখ্যা সীমিত এবং অধিকাংশ শেয়ারই দুর্বল বা জাঙ্ক হিসেবে বিবেচিত। এর ফলে বাজারে বিনিয়োগের পরিবেশ ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে এই লেনদেনকে ‘জুয়াখেলা’র সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে, যা বিনিয়োগ সংস্কৃতির জন্য অশনি সংকেত। এই পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। দুর্বল ও মানহীন কোম্পানির তালিকাভুক্তি। আইপিও অনুমোদনের ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই-বাছাইয়ের ঘাটতি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন দীর্ঘদিনের। এছাড়াও তালিকাভুক্তির পর কোম্পানিগুলোর ওপর কার্যকর তদারকির অভাব। অনেক প্রতিষ্ঠান ধারাবাহিকভাবে লোকসান করলেও বা উৎপাদন বন্ধ রাখলেও তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আরও উদ্বেগজনক হলো, বাজারে ভালো মানের নতুন কোম্পানির আগমন প্রায় বন্ধ। গত দুই বছরে কোনো নতুন আইপিও না আসা বিনিয়োগকারীদের জন্য বিকল্প সুযোগ সীমিত করে দিয়েছে। ফলে বাজারে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে এবং বিদ্যমান দুর্বল কোম্পানিগুলোর প্রভাব বেড়েছে। বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতার প্রতিফলন দেখা যায় বিও অ্যাকাউন্টের সংখ্যায়। একসময় যেখানে ৩০ লাখের বেশি বিনিয়োগকারী সক্রিয় ছিলেন, বর্তমানে সেই সংখ্যা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; বরং বাজার থেকে সাধারণ মানুষের আস্থা হারানোর প্রতিচ্ছবি। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার। দুর্বল ও অকার্যকর কোম্পানিগুলোকে তালিকাচ্যুত করার বিষয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এবং নতুন ও শক্তিশালী কোম্পানিকে বাজারে আনতে প্রণোদনা ও নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি। শেয়ারবাজার একটি দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সূচক। এটি যদি জাঙ্ক কোম্পানির ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়ে, তাহলে বিনিয়োগ পরিবেশ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই এখনই সময়, আস্থা পুনর্গঠনের লক্ষ্যে কার্যকর ও সাহসী পদক্ষেপ নেওয়ার-নইলে এই সংকট আরও গভীর হবে।