দশত তিনেক আগেও গ্রামীণ জনপদে মাটির তৈরি থালা-বাসন, কলস আর হাড়ি পাতিলের জয় জয় কার ছিল। গৃহস্থালি থেকে শুরু করে উৎসব-পার্বন-সবখানেই মাটির তৈরি জিনিসের বিকল্প ছিল না। কিন্তু কালের বিবর্তনে এবং প্লাস্টিক ও মেলামাইন পণ্যের সস্তা আর সহজলভ্যতার দাপটে দেশের ঐতিহাসিক মৃৎশিল্প এখন বিলুপ্তের পথে। দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলা পালপাড়া কারীগর ও পরিবারের সদস্যরা এখন নিদারুন অর্থ কষ্টে দিন পার করছেন। খুঁজছেন বিকল্প পেশা। গ্রাম বাংলার প্রাচীণ এই শিল্প এখন কেবল প্রদর্শণী আর সৌখিনতার বস্তুতে পরিনত হয়েছে।
মৃৎশিল্পি রবিন চন্দ্র বলেন, প্লাস্টিক ও সীলভারের ভীড়ে আমাদের মাটির জিনিসের এখন চাহিদা নেই। আগে যেখানে কাহারোল হাটে বিক্রি করতাম সাত থেকে আট হাজার টাকা বর্তমানে বিক্রি হয় এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত। স্বল্প সুদে সামান্য ঋণ ছাড়া সরকারি কোন সুবিধা আমরা পাই নাই। বর্তমানে কোন মতে খেয়ে পরে থাকলেও সঞ্চয় বলতে কিছুই নেই। সরকার যদি আমাদের চাঁকা ঘোরানোর মটর বা মাটি ছারার মেশিন দিয়ে সহায়তা করতো তবে এই আদি পেশায় টিকে থাকা আমাদের জন্য সহজ হতো। পূর্ব সুলতানপুর পাল পাড়া গ্রামের দুলাল চন্দ্র পাল বলেন, বর্তমানে প্লাস্টিক পণ্যের ব্যাপক প্রসারের ফলে মাটির জিনিসের আগের মতো কদর নেই। মানুষ এখন মাটির তৈরি জিনিসপত্র তেমন একটা পছন্দ করে না। যার ফলে আমরা চরম সংকটে পড়েছি। দীর্ঘদিনের পুরনো এই পেশা না পারি ছাড়তে, না পারি চালিয়ে নিতে। কেবল পেটের দায়ে কোন রকম টিকে আছি। মৃৎশিল্পি হরিশ বলেন, আগে যেখানে ১০ ভাগ বিক্রি হতো এখন সেখানে আধা ভাগও হয় না। হাড় ভাঙ্গা খাটুনি আর কবজির ব্যাথা সহ্য করে বাপ-দাদার এই পেশা কোন মতে টিকিয়ে রেখেছি ঠিকই কিন্তু লাভের মুখ দেখছি না। সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে কিছু প্রশিক্ষণ ও ঋণ পেলেও তা পর্যাপ্ত নয়। আবার সেই টাকা কিস্তিতেই শোধ করতে হয়। কষ্টের কাজ হওয়ায় আমার সন্তানরাও অন্য পেশায় চলে গেছে। এখন সরকারিভাবে যদি আমাদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি আধুনিক যন্ত্রপাতি বা মোটর দেওয়া হতো তবে আমাদের মতো বয়স্কদের জন্য এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখা সহজ হতো। কাহারোল উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোকলেদা খাতুন মীম জানান, কাহারোলের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প সম্পর্কে আমরা অবগত আছি। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো বিলুপ্ত প্রায় এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রয়োজনীয় সকল প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহন করা হবে।