দীর্ঘ ছয় বছরের নিস্তব্ধতা ভেঙে আবারও প্রাণচাঞ্চল্যে মুখর হতে যাচ্ছে বরিশালের ব্যবসা-বাণিজ্যের অঙ্গন। বহু প্রতীক্ষিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা আগামী ১০ মে থেকে শুরু হতে যাচ্ছে। এ নিয়ে ইতোমধ্যেই নগরজুড়ে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। প্রস্তুতির ব্যস্ততায় দিন কাটাচ্ছে আয়োজক প্রতিষ্ঠান বরিশাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির কর্মকর্তাদের।
জানা গেছে, বরিশাল জেলা প্রশাসনের অনুমোদনক্রমে এবারের মেলা নতুন আঙ্গিকে ও নতুন ভেন্যুতে আয়োজন করা হচ্ছে। নগরীর পরশ সাগর মাঠে বসবে এ জমজমাট বাণিজ্যিক আসর। জেলা প্রশাসক মো. খাইরুল ইসলাম সুমনের সম্মতিতে মেলার সব কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। মেলা আয়োজনের অনুমতি দেওয়ায় স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো হয়েছে। মেলা উদ্বোধনকে ঘিরে থাকছে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন। অনুষ্ঠানে বরিশালের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসকসহ প্রশাসন ও রাজনৈতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। পাশাপাশি বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক এবং বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার সম্মতিজ্ঞাপন করেছেন। এতে করে মেলার গুরুত্ব ও ব্যাপ্তি আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বরিশালে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার ইতিহাস খুব বেশি সমৃদ্ধ না হলেও এর স্মৃতি এখনও অনেকের মনে দাগ কেটে আছে। সর্বশেষ ২০২০ সালে অনুষ্ঠিত মেলাটি সম্ভাবনার দ্বার খুললেও নানা অনিয়মের কারণে শেষ পর্যন্ত প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।
বিশেষ করে চাঁদাবাজি, স্টল বরাদ্দে অতিরিক্ত অর্থ দাবি এবং ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা নিয়ে ব্যাপক অভিযোগ ওঠে। তৎকালীন অনেক উদ্যোক্তা অভিযোগ করেছিলেন, মেলায় অংশগ্রহণ করতে গিয়ে তারা আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ফলে আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও অনেক ব্যবসায়ী শেষ মুহুর্তে অংশগ্রহণ থেকে সরে দাঁড়ান। দর্শনার্থীদের মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি হয়, যা পুরো আয়োজনের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তবে সেই ব্যর্থতার মধ্যেও একটি ইতিবাচক দিক ছিল, বরিশালে বড় পরিসরে বাণিজ্যিক মেলার সম্ভাবনা যে রয়েছে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেই অভিজ্ঞতাই আজকের আয়োজকদের জন্য বড় শিক্ষা হিসেবে কাজ করছে। এবারের মেলাকে ঘিরে আয়োজকদের বক্তব্যে স্পষ্ট, অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি স্বচ্ছ, সুশৃঙ্খল এবং পরিবারবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাই তাদের মূল লক্ষ্য। বরিশাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আলহাজ মো. এবায়েদুল হক চাঁন জানিয়েছেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ইতোমধ্যে শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণের আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
তিনি বলেন, “আমরা চাই এবারের মেলাটি শুধু বাণিজ্যিক লেনদেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে একটি সার্বিক সামাজিক উৎসবে পরিণত হোক। এখানে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা মানুষ যেন নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, সেটাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।” মেলায় থাকছে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়িক স্টল, দেশীয় পণ্যের প্রদর্শনী, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের নতুনত্ব এবং দর্শনার্থীদের জন্য নানা বিনোদনমূলক আয়োজন। শিশুদের জন্য আলাদা বিনোদন জোন, খাবারের স্টল এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও থাকছে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে। অতীতের বিতর্কিত অভিজ্ঞতা থেকে বেরিয়ে আসতে এবারের আয়োজকরা শুরু থেকেই কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। চাঁদাবাজি, জুয়া বা অশ্লীল কার্যক্রমের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তত্ত্বাবধানে পুরো মেলা প্রাঙ্গণ নিরাপত্তা বেষ্টনির মধ্যে রাখার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। আয়োজকদের মতে, একটি সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে ব্যবসায়ীরা যেমন আস্থা ফিরে পাবেন, তেমনি সাধারণ দর্শনার্থীরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করবেন। ব্যবসায়ী মহল মনে করছে, দীর্ঘদিন পর এই মেলার আয়োজন বরিশালের অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করতে পারে। পাশাপাশি স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য এটি হবে নিজেদের পণ্য তুলে ধরার বড় সুযোগ। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে নতুন বাজার তৈরির সম্ভাবনাও তৈরি হবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি আয়োজন সফল হয়, তবে এটি শুধু একটি মেলায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং ভবিষ্যতে বরিশালকে দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পথ সুগম করবে। সব মিলিয়ে, বহু প্রতীক্ষার পর শুরু হতে যাওয়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলাকে ঘিরে বরিশালবাসীর প্রত্যাশা এখন তুঙ্গে। অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা পেছনে ফেলে নতুন এক সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে যাচ্ছে এই আয়োজন, যেখানে বাণিজ্য, বিনোদন ও সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য মিলনমেলা গড়ে ওঠার অপেক্ষা।