কালীগঞ্জে আঙুর চাষে কলেজ ছাত্রের অসাধারণ সাফল্য

এফএনএস (টিপু সুলতান; কালীগঞ্জ, ঝিনাইদহ) : | প্রকাশ: ৯ মে, ২০২৬, ০৫:২৪ পিএম
কালীগঞ্জে আঙুর চাষে কলেজ ছাত্রের অসাধারণ সাফল্য

ঝিনাইদহ কালীগঞ্জে এক কলেজ ছাত্র রাকিব হাছান আঙুর চাষে অসাধারণ সাফল্য পেয়েছেন। তিনি কোটচাদপুর সরকারি কলেজের ইতিহাস অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র। বাগানটি দেখতে প্রতিদিন ভিড় করছেন অনেক মানুষ। উদ্যোক্তা রাকিব হাছান লেখাপড়ার পাশাপাশি ২০২৪ সালে মে মাসে ১০ কাঠা জমিতে বাইকুনুর ও ব্লাক ম্যাজিক জাতের আঙুরের চারা রোপণ করেন। প্রায় দুই বছর আগে আঙুর গাছের চারা রোপন করেন ও গাছে আঙুর ধোরেছে প্রচুর পরিমানে।তিনি বলেন আমার কোনো প্রশিক্ষন বা পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না, ইন্টারনেট আর নিজের প্রচেষ্টাই ছিল তার ভরসা।এখন তিনি আঙুর উৎপাদনের পাশাপাশি চারা তৈরি করে বিক্রি শুরু করেছেন। এ বছর তার বাগানের প্রতিটি গাছেই ফল এসেছে। আঙুরের আকৃতি ও রঙ দুটোই আকর্ষণীয় আর স্বাদে বেশ মিষ্টি।

সবুজের এমন ভিন্নধর্মী উদ্যোগ নজর কেড়েছে স্থানীয়দের। তার এই আঙুর বাগান দেখতে প্রতিদিন ভিড় করছেন বিভিন্ন এলাকার মানুষ।সবুজের বাগান দেখতে আসা মিজানুর রহমান ও সোহাগ আলী বলেন, আঙুর বাগান শুনেই মুলত দেখতে আসা। আঙুর খেয়েও দেখলাম অনেক মিষ্টি, সবুজের উদ্যগকে আমরা অভিনন্দন জানাই।বাগান দেখতে আসা মধুগঞ্জ বাজারের মুশফিকুর রহমান মাহামুদ বলেন, বাজারের আঙুরের চেয়ে এই বাগানের আঙুরের স্বাদ হাজার গুণ ভালো। রাকিব হাছান প্রায় ৪৬ হাজার টাকা দিয়ে ১২০ টি আঙুরের চারা ক্রয় করেন। পরবর্তিতে ১০ কাঠা জমিতে মাচা তৈরি, সেচ, সার-কীটনাশক ও পরিচর্যা বাবদ আরো ৬০ হাজার টাকা ব্যায় করেন। ফলে ১০ শতক জমিতে প্রায় এক লাখ টাকা ব্যয় হয়। চারা রোপণের এক বছরের মাথায় ২০২৫ সালের মে মাসে তিনি দুই লাখ টাকার আঙুর বিক্রি করেন। এতে খরচ বাদে তার এক লাখ টাকা লাভ থাকে।

বাইকুনুর জাতের মিষ্টি আঙুরের চাষ করে সফল হয়েছেন রাকিব হাছান। বাইকুনুর রাশিয়ার উন্নত জাতের একটি উচ্চ ফলনশীল আঙুর। দেশের মাটিতে বিদেশি আঙুরের চারা রোপণের প্রথম বছরের মাথায় তিনি লাভ পেয়েছিলেন এক লাখ টাকা। চলতি বছর সেই বাগান থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকার আঙুর ফল বিক্রি করেছেন।রাকিব হাছান ঝিনাইদহ কোটচাঁদপুর উপজেলার লক্ষ্ীপুর গ্রামের আব্দুর রবের ছেলে। তিনি কালীগঞ্জ উপজেলার গোমরাইল গ্রামে মামার বাড়িতে থেকে লেখাপড়া করেন। পাশাপাশি ২০২৪ সালে মে মাসে ১০ কাঠা জমিতে বাইকুনুর ও ব্লাক ম্যাজিক জাতের আঙুরের চারা রোপণ করেন।এদিকে চলতি বছর সেচ, সার ও পরিচর্যা বাবদ রাকিবের ১৫ হাজার টাকা খরচ ছাড়া অতিরিক্ত খরচ হয়নি। এ বছর তিনি বাগান থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকার আঙুর বিক্রি করেছেন। বাগানে এখনও অনেক আঙুর ঝুলে আছে। স্থানীয় বাজারে তার উৎপাদিত আঙুর প্রতি কেজি ৩০০ টাকা থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতিটি আঙুর গাছ থেকে ২০ থেকে ৩০ কেজি ফল পাওয়া যাচ্ছে। গাছ যত বড় হবে, ফল তত বেশি হবে। এছাড়া তিনি দুই লাখ টাকার চারা বিক্রির অগ্রিম অর্ডার পেয়েছেন।বাইকুনুর ও ব্ল্যাক ম্যাজিক জাতের আঙুর মিষ্টি ও সুস্বাদু। এ আঙুরে কোনো বিচি থাকে না কিন্তু কিছু কিছু আঙুরের মধ্যে বীজ আছে। সেগুলো ওষুধের মাধ্যমে সিডলেস করা যায়।বাগানের উদ্যোক্তা রাকিব বলেন, আমি প্রথমে কয়েকটি আঙুর গাছের ফল ছিল টক। ফলন ভালো কিন্তু স্বাদ টক দেখে আমার কৌতুহল হয়। পরবর্তীতে আমি এটা নিয়ে বিভিন্ন গবেষনা করি। অনেক জাতের আঙুর গাছের খবর পাই কিন্তু আমার গাছ লাগানোর জায়গা নেই। 

কৃষি বিভাগ বা সরকার যদি আমাকে সহযোগিতা করে, পাশে থাকে তাহলে আমার স্বপ্ন এই আঙুর আমার পুরো ঝিনাইদহ জেলায় আমি ছড়িয়ে দেব। রাকিব হাছানের মামা কালীগঞ্জ উপজেলার গোমরাইল গ্রামের এমদাদুল হক বলেন, ছোটবেলা থেকেই আমার ভাগ্নে বিভিন্ন গাছের প্রতি অন্যরকম ভালবাসা ছিল। সে প্রধমে আঙুর গাছ ১০ কাঠা জমিতে রোপন করে, গাছে ফলন ভালো আসে কিন্তু এর স্বাদ টক হওয়ায় সে এটা নিয়ে কাজ করে। এখন দেখি সব গাছে ভালো ফল ধোরেছে, পাশাপাশি সে এখন চারা বিক্রি করছে। সরকার  যদি তাকে সহযোগিতা করে তাহলে সে আরও এগিয়ে যাবে। সে আঙুরের গাছ রোপন করবে এমন উদ্যেগের কথা শুনে তাকে আমি অনুমতি দিই। গাছ রোপন করার পর তার গাছের প্রতি পরিচর্যা ও ভালবাসা দেখে অবাক হয়েছি। 

কালীগঞ্জে এই প্রথমবারের ন্যায় একজন কলেজ ছাত্র বাণিজ্যিক ভাবে বাইকুনুর জাতের আঙুর উৎপাদনে সফলতা পেয়েছেন উদ্যোক্তা রাকিব হাছান। এই সাফল্য দেখে স্থানীয় কৃষক ও তরুণরা উদ্যোক্তাদের মধ্যে আঙুরচাষে আগ্রহ বাড়ছে।রাশিয়ার মতো শীতের দেশের আঙুর যে কালীগঞ্জের মাটিতে হবে গ্রামের কেউই বিশ্বাস করতো না। আট মাসের মাথায় গাছে ফল ধরতে শুরু করলে আত্মবিশ্বাস বাড়ে।পরবর্তীতে ধাপে ধাপে গাছের সংখ্যা বেড়েছে বাণিজ্যিক ভাবে ফল সংগ্রহ ও বিক্রি শুরু করেন।উদ্যোক্তা একজন ছাত্র হলে ও কৃষক লিজ নেওয়া জমিতে এই বাগান গড়ে তুলেছেন। রাকিব বলেন, দেশের বাইরে থাকা মোবাইল ফোনে দেখে সখ করে আঙুর চাষের ধারণা পাই। পরে মামা এমদাদুল হকের সঙ্গে আলোচনা করে উদ্যোগ নিই। অনেক বাধা ছিল, কিন্তু এখন সফলতা পেয়ে ভালো লাগছে।কালীগঞ্জ বাসষ্টান্ডে ফল ব্যবসায়ী মানু বাবু বলেন, স্থানীয় ভাবে উৎপাদিত এ আঙুর বাজারে খুব ভালো সাড়া পেয়েছে। ক্রেতারা কিনে খুশি। বিদেশি আঙুরের মতোই স্বাদ ও আকার। কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহাবুব আলম রনি বলেন, কয়েক বছর ধরে উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকার মধ্যে বেশ কিছু চাষি আঙুর চাষ করছেন। আমরা তাদের উৎসাহ ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছি।কিন্তু নিজের জায়গা না থাকলেও থেমে থাকেননি কৃষি উদ্যোক্তাা কলেজ ছাত্র রাকিব হাছান।তার এমন উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই। আমাদের কৃষি বিভাগ তার পাশে থাকবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে