রাজশাহী সুগার মিলে পাঁচবছরে লোকসান ৩০৪ কোটি টাকা

এম এম মামুন; রাজশাহী | প্রকাশ: ২২ মে, ২০২৬, ০৪:৪৬ পিএম
রাজশাহী সুগার মিলে পাঁচবছরে লোকসান ৩০৪ কোটি টাকা

আখ সংকট ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ার কারণে ধারাবাহিক লোকসানের মধ্যে দিয়ে প্রতিবছর চলছে রাজশাহী সুগার মিল। গত পাঁচ বছরে লোকসানের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০৪ কোটি টাকা। মিলের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ইতিহাস ঘেটে জানা গেছে, রাজশাহী সুগার মিল ১৯৬২ সালে এ শিল্প প্রতিষ্ঠানটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে ১৯৬৫ সালে সমাপ্ত হয়। পরে ১৯৬৫-৬৬ সাল থেকে এটিতে চিনির উৎপাদন শুরু হয়। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকার এই প্রতিষ্ঠানটিকে রাষ্ট্রয়াত্ত্ব প্রতিষ্ঠান হিসেবে ঘোষণা করে। জেলার পবা উপজেলার হরিয়ান ইউনিয়নে রাজশাহী সুগার মিল অবস্থিত। একসময় উত্তরাঞ্চলের আখচাষি ও শ্রমজীবী মানুষের অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তি ছিল রাজশাহীর সুগার মিল। স্থানীয় কৃষকের উৎপাদিত আখ দিয়ে চলত মিলের চাকা, আর সেই মিলকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল হাজারো মানুষের জীবিকা। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই ঐতিহ্যবাহী শিল্প প্রতিষ্ঠান এখন লোকসানের ভারে নুইয়ে পড়েছে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, আখের সংকট, পুরোনো যন্ত্রপাতি, ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা এবং বাজারে আমদানিনির্ভর চিনির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ায় ক্রমেই সংকট ঘনীভূত হচ্ছে এই চিনিকলকে ঘিরে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত কয়েক বছর ধরেই উৎপাদন খরচের তুলনায় বিক্রি থেকে প্রত্যাশিত আয় হচ্ছে না। মিল চালু রাখতে সরকারকে নিয়মিত ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। অথচ মৌসুমে আখ সংগ্রহ কমে যাওয়ায় পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনও সম্ভব হচ্ছে না। এতে উৎপাদিত প্রতি কেজি চিনির খরচ বাজার মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দাঁড়াচ্ছে, যা লোকসানের বড় কারণ হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত পাঁচ বছরে এই মিল চালু ছিল সর্বমোট ১৭৩ দিন। এতে আর্থিক লোকসান হয় ৩০৪ কোটি টাকা। হিসেব অনুযায়ী গড়ে মিল চালু অবস্থায় একদিনে দেড় কোটি টাকার লোকসান হয়েছে। পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ২০২১-২২ অর্থবছরে মিল চালু ছিল ১৯ দিন এবং এতে লোকসান হয় ৬৩ কোটি টাকা। পরবর্তী অর্থ বছরের ২১ দিনে লোকসান হয় বিগত বছরের সমপরিমাণ টাকা। পরবর্তী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩৫ দিনে লোকসানের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬৬ কোটি টাকা, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬৯ কোটি টাকা এবং সর্বশেষ চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও লোকসান হয় প্রায় ৭০ কোটি টাকা। রাজশাহী সুগার মিলের মহাব্যবস্থাপক (অর্থ) জামাল হোসেন বলেন, আমাদের মিলের জন্য যে পরিমাণ আখ প্রয়োজন তা আমরা পাচ্ছি না। আখচাষিরা বাইরে বেশি দামে গুড় ব্যবসায়ীদের কাছে আখ বিক্রি করছেন। আমাদের মিলে ৩ মাসে ১৪০ হাজার টন আখ প্রয়োজন, যা আমরা পর্যাপ্ত পরিমাণ পাচ্ছি না। এই আখ সংকটেও মিল বন্ধ থাকছে। এছাড়াও আমাদের মিলের বয়স হয়েছে প্রায় ৬৫ বছর। পুরাতন যন্ত্রপাতি মেরামতেও ব্যয় বেড়েছে। সেজন্য আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছেই। তথ্য অনুযায়ী গত পাঁচ বছরে সুগার মিল থেকে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১১ হাজার মেট্রিক টন চিনি। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে চিনি উৎপাদন হয়েছে ৩ হাজার ১৭২ মেট্রিক টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ হাজার ৫৬৭ মেট্রিক টন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ হাজার ৮৬৫ মেট্রিক টন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১ হাজার ৩৫৬ মেট্রিক টন এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ১ হাজার ৩১৮ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদন হয়েছিল।সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সুগার মিলে প্রতি কেজি চিনি উৎপাদনে খরচ হয়েছে প্রায় ৩৫০ টাকা এবং এটি বিক্রি হয়েছে ১২৫ টাকায়। ফলে আর্থিক ক্ষতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭০ কোটি টাকায়।কৃষক ও শ্রমিকেরা বর্তমান সময়ে আখ চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন জানিয়ে সুগার মিলের সহকারী ব্যবস্থাপক (ভান্ডার) খন্দকার আব্দুল মতিন বলেন, মানুষ এখন আখ চাষ করতে আগ্রহী নয়। এক বছরে তিন-চারটি ফসল উঠলেও আখ লাগালে জমিতে একবার ফল পাওয়ার পর আর লাভ হয় না। এছাড়াও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে কৃষক অন্য আবাদে ঝুঁকছেন। ফলে আমরা আমাদের মিলের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ আখ পাচ্ছি না। আমাদের এই অঞ্চলে যদি আবার আখের আবাদ বাড়ানো হয়, আখের উৎপাদন বেশি হয় তাহলে আমি মনে করি আমাদের মিলের সুদিন ফিরে আসবে। সুগার মিল থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আখ মাড়াই হয়েছে ৬০ হাজার ৬২০ মেট্রিক টন, যা সুগার মিলের জন্য পর্যাপ্ত নয়। এর আগের বছর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আখ মাড়াই হয়েছিল ৭০ হাজার ৭২০ মেট্রিক টন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪২ হাজার ৭১২ মেট্রিক টন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২৬ হাজার ৪৪ মেট্রিক টন এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ২৪ হাজার ৩ মেট্রিক টন। যা সুগার মিলের প্রয়োজনের তুলনায় এক-চতুর্থাংশের কাছাকাছি। বাংলাদেশে ১৬টি সুগার মিল ছিল। ক্রমাগত লোকসানের কারণে ২০২০ সালে সরকার ছয়টি সুগার মিল বন্ধ করে। সেই সময় রাজশাহী সুগার মিলও বন্ধ হয়ে যাবে বলে গুঞ্জন উঠেছিল। এ কারণে রাজশাহী সুগার মিল থেকে চাষিদের সরবরাহের জন্য সার, বীজ, কীটনাশকসহ অন্যান্য কৃষিজাত উপকরণ অন্য সুগার মিলসে প্রেরণ করা হয়েছিল। এতে আখ চাষের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ভেবে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন চাষিরা। এর ফলে বিরূপ প্রভাব পড়ে রাজশাহী সুগার মিলের উপর। একারণে আখ সংকটের কারণে গত পাঁচ বছরে চিনির উৎপাদন কমে আসে। এদিকে ১২৪৭টি পদের বিপরীতে রাজশাহী সুগার মিলে বর্তমানে কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন ৩৫ জন এবং বাকি ৫৪৫ জন কর্মচারী-শ্রমিক রয়েছেন (স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে)। এত সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী সংকটেও ধুঁকছে প্রাচীন এই শিল্প প্রতিষ্ঠানটি। সুগার মিলসটি ২২৯ দশমিক ৫৭৫ একর জায়গা জুড়ে অবস্থিত। এর মধ্যে ১০০ একরের মধ্যে রয়েছে মিল ক্যাম্পাস অর্থাৎ আবাসিক কলোনি, স্কুল, স্কুল মাঠ, মসজিদ, মেডিকেল, কারখানা, গেষ্ট হাউজ, গাড়ী পার্কিং এর গ্যারেজ, প্রশাসনিক ভবন, জৈব সার কারখানা, রাস্তা-ঘাট ও সাব-জোন। ১১০ একরে রয়েছে পরীক্ষামূলক খামার এবং বাকি প্রায় ২০ একর জায়গাজুড়ে রয়েছে সাবজোন অফিস ও আখ ক্রয় কেন্দ্র। রাজশাহী সুগার মিলস লিমিটেডের শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি মাসুদ রানা বলেন, আখের স্বল্পতা এবং জনবল কম থাকায় মিলটি বন্ধ হওয়ার পথে। আমাদের এখানে ১২৪৭টি পদ রয়েছে যেখানে সাড়ে চারশো লোকবল কাজ করছে। দক্ষ শ্রমিক-কর্মচারী ছাড়া চিনি উৎপাদন সম্ভব না। কিন্তু আমাদের এখানে দিন দিন দক্ষ শ্রমিক-কর্মচারী হারিয়ে যাচ্ছে। যার কারণ হলো আমাদের মিলটি সারা বছর চলে না। এছাড়াও চিনি উৎপাদনে প্যানম্যান নেই, ফিটার নেই, প্রয়োজনীয় মেকানিক্স নেই। সুগার মিল সুদের টাকা টানতে গিয়ে বারবার লোকসানে যাচ্ছে। আমি মনে করি এগুলো বিষয়ে সরকারি পদক্ষেপ প্রয়োজন। চিনিকল সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “মিলকে লাভজনক করতে প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন, উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং কৃষকদের আখ চাষে উৎসাহিত করার বিকল্প নেই। পাশাপাশি উপজাত পণ্য উৎপাদনের দিকেও নজর দিতে হবে। রাজশাহী চিনিকল ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ুন কবির বলেন, সরকারি ভর্তুকি দিয়েই সুগার মিল চলছে। আমাদের এই মিল মৌসুমি। প্রতিবছর শীতের সময় দু-তিন মাস চলে। আমাদের এই অঞ্চলে আখের উৎপাদন কমে গেছে। মূলত আখ থেকে মুনাফা কম পাওয়ায় চাষিরা অন্য লাভজনক চাষে ঝুঁকছেন। আর উৎপাদন খরচ যে হারে বাড়ছে, দাম সে হারে বাড়ছে না বলে লোকসানের মুখে পড়ছে প্রতিষ্ঠান।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে