প্রবাসীদের রেমিট্যান্স দেশের অন্যতম আয় হলেও জনশক্তি রপ্তানিতে নেমেছে ধস

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ২৪ মে, ২০২৬, ০৮:১০ এএম
প্রবাসীদের রেমিট্যান্স দেশের অন্যতম আয় হলেও জনশক্তি রপ্তানিতে নেমেছে ধস

দেশে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম উৎস প্রবাসীদের রেমিট্যান্স। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানিতে ধস নেমেছে। চলমান মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্কটে গত দুই মাসে বিপুল সংখ্যায় কমেছে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে কর্মী পাঠানো। গত বছরের ১ মার্চ থেকে ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত এক লাখ ৪৩ হাজার ৩৫১ কর্মী বিদেশ গিয়েছিলো। আর চলতি বছরের একই সময়ে মাত্র ৮২ হাজার ৫৬১ জন গেছে। ফলে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছর ৬০ হাজার ৭৯০ জন বা ৪২ দশমিক ৪০ শতাংশ কম জনশক্তি রপ্তানি হয়েছে। আর ২০২৪ সালের একই সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে চলতি বছরের মার্চ-এপ্রিলের তুলনায় ওই সময় প্রায় দ্বিগুণ কর্মী বিদেশে পাঠানো হয়েছিল। ২০২৪ সালের মার্চ এবং এপ্রিল মাসে বিদেশ গিয়েছিলো ১ লাখ ৬০ হাজার ১৪ জন কর্মী। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) এবং জনশক্তি রপ্তানি খাত সংশ্লিষ্টদের সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বাংলাদেশের অন্যতম বড় শ্রমবাজার মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, জর্ডানই শুধু নয়, সিঙ্গাপুরেও কর্মী পাঠানো কমেছে। আর বাংলাদেশিদের জন্য আগের বছরগুলোর মতোই বন্ধ রয়েছে মালয়েশিয়া, ওমান, বাহরাইনের শ্রমবাজার। তাছাড়া জাপান, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো শ্রমবাজারেও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অগ্রগতি নেই। আর অস্ট্রেলিয়া, গ্রিসের মতো দেশগুলোর সাথে কর্মী পাঠানোয় সমঝোতা স্মারক সই হলেও শ্রমবাজার খোলেনি। পাশাপাশি রোমানিয়া, ক্রোয়েশিয়া, পোল্যান্ডের মতো ইউরোপের শ্রমবাজার বন্ধ হয়েছে। ওসব দেশের ভিসা পেতে বাংলাদেশিদের ভারতের নয়াদিল্লীতে দূতাবাসে যেতে হয়।  কিন্তু জুলাই আন্দোলনের পর ভারতের ভিসা পাওয়া কঠিন হয়ে ওঠায় বাংলাদেশী কর্মীরা দিল্লি যেতে পারছে না। আবার ইউরোপের ওই দেশগুলোতে গিয়ে কর্মস্থল ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ায় নিয়োগকারীরা কর্মী নিয়োগ কমিয়ে দিয়েছে। ইউরোপের দেশে প্রবেশের পথ হয়ে ওঠায় বাংলাদেশিদের জন্য প্রায় বন্ধের পথে কিরগিজস্তানের শ্রমবাজারও। 

সূত্র জানায়, বিগত ২০২৫ সালে বিদেশে চাকরির ছাড়পত্র নেন ১১ লাখ ৩২ হাজার ৩৩৭ কর্মী। তার মধ্যে সৌদি আরবে ৭ লাখ ৫৫ হাজার ২০৯ জনের গন্তব্য ছিল। যা মোট চাকরির ৬৬ দশমিক ৬৯ শতাংশ ছিলো। তাছাড়া গত বছর উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশ কাতারে এক লাখ সাত হাজার ৬০৩ জন কর্মী গিয়েছে। কুয়েতে গিয়েছে ৪২ হাজার ৭৩৮ জন, আরব আমিরাতে ১৩ হাজার ৭৫৪ জন গিয়েছিলো। তাছাড়া জর্ডান যেতে ছাড়পত্র নেয় ১২ হাজার ৩২৯ জন কর্মী। সব মিলিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের (জিসিসি) দেশগুলোতে ৮ লাখ ৮৮ হাজার ৮৯৫ জন বাংলাদেশী কর্মী গিয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশি কর্মীর ৭৮ শতাংশের কর্মসংস্থান ওসব দেশে হয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল  আগ্রাসন শুরু করলে প্রতিরোধে ইরান সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও জর্ডানে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালায়। তার প্রভাবে ওই দেশগুলোতে বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থান কমেছে। গত বছরের ১ মার্চ থেকে ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত এক লাখ দুই হাজার ১০৪ জন কর্মী সৌদি আরব গিয়েছিলো। আর চলতি বছরে একই সময়ে গিয়েছে ৪৪ হাজার ৮৭৬ জন। ফলে কর্মসংস্থান কমেছে ৫৭ হাজার ২২৮ বা ৫৬ শতাংশ। তাছভাড়া গত বছরের ১ মার্চ থেকে ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত কাতার ১৪ হাজার ৫৩২ জন গিয়েছিলো। এ বছর গিয়েছে চার হাজার ৭২৪ জন। ফলে কর্মসংস্থান ৬৯ শতাংশ কমেছে। ওই কুয়েত গিয়েছিলো তিন হাজার ৫৫৮ জন আর এ বছর গিয়েছে দুই হাজার ৬১৩ জন। কর্মসংস্থান কমেছে ২৭ শতাংশ। তবে যুদ্ধের মধ্যেও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ জর্ডান এবং আরব আমিরাতে। তবে তা খুবই সামান্যই। গত বছরের ১ মার্চ থেকে ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত এক হাজার ৬২৩ জন জর্ডান গিয়েছিলো। আর চলতি বছরে একই সময়ে গিয়েছে এক হাজার ৯৯৯ জন। আরব আমিরাত গিয়েছিলো ৫৪০ জন। আর এবার গিয়েছে এক হাজার ৯৬৭ জন। যদিও যুদ্ধের আগে গত বছরের জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারি এবং চলতি বছরের একই সময়ে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের প্রায় সমান ছিলো। ২০২৫ সালের প্রথম দুই মাসে বৈদেশিক সংস্থান ছিল এক লাখ ৬০ হাজার ২৯১ জনের। চলতি বছরে গেছে এক লাখ ৬০ হাজার ৭২৬ জন। তবে সামগ্রিক অভিবাসন কমেছে। গত বছরের প্রথম চার মাসে বিদেশে চাকরি নিয়ে দেশ ছাড়ে তিন লাখ তিন হাজার ৬৪২ জন। কিন্তু ওই সংখ্যা চলতি বছরের প্রথম চার মাসে দুই লাখ ৪৩ হাজার ২৮৭ জনে নেমে আসে। 

সূত্র আরো জানায়, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বিগত ২০২৪ সালের মে মাসে বন্ধের পর সিঙ্গাপুরই ছিলো বাংলাদেশীদের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার। গত বছরে ৭০ হাজার ৮৩৫ বাংলাদেশি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ সিঙ্গাপুরে গিয়েছিলো। কিন্তু চলতি বছরের প্রথম চার মাসে ওই সংখ্যা মাত্র ২২ হাজার ১২৬। অর্থাৎ ওই শ্রমবাজার প্রসারিত হয়নি। তাছাড়া উচ্চ বেতন এবং ভালো কর্মপরিবেশের জন্য জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার খ্যাতি রয়েছে। কিন্তু ওই দুই দেশেও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অগ্রগতি হচ্ছে না। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে জাপানে ৫৯০ জন চাকরি নিয়ে গিয়েছে। ২০২৫ সালে ওই সংখ্যা ছিল এক হাজার ৫৬৪ জন আর ২০২৪ সালে ছিরো এক হাজার ৫৮ জন। ২০২৪ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় দুই হাজার ৮২৬ জন বাংলাদেশি চাকরি নিয়ে যায়। কিন্তু ২০২৫ সালে ওই দেশে মাত্র দুই হাজার ৪৩৬ জনের কর্মসংস্থান হয়। আর চলতি বছর প্রথম চার মাসে ওই সংখ্যা নেমে আসে ৪৮৪ জনে। নিম্ন জন্মহারের কারণে জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় জনসংখ্যা কমায় অনেক বছর ধরেই কর্মী ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশ সুযোগ নেয়ার কথা বলছে। কিন্তু বাস্তবে অগ্রগতি নেই। একই অবস্থা ইতালি, পর্তুগালের মতো উন্নত দেশের শ্রমবাজারের ক্ষেত্রেও। গত বছরের প্রথম চার মাসে বৈধপথে ইতালিতে এক হাজার ২২২ জন যায়। আর চলতি বছরে ওই সংখ্যা মাত্র তিন হাজার ২৬১ জন। তবে অবৈধ পথে ইতালিতে যাওয়া বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে আনতে দেশটি চাপ দিচ্ছে। গত বছরের প্রথম চার মাসে দুই হাজার ৮৪ জন পর্তুগাল গিয়েছিলো। আর চলতি বছর দুই হাজার ৬৯ জন গেছে।

এদিকে চলতি মাসের শুরুতে সরকারের পক্ষ থেকে জনশক্তি রপ্তানি বিষয়ে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলোচনা হয়েছে। প্রায় দুই বছর রিক্রুটিং এজেন্সি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে ওই দেশটিতে কর্মী যাওয়া বন্ধ রয়েছে। গত ৯ এপ্রিল যৌথ বিবৃতিতে দুই দেশ জানিয়েছে, শ্রমবাজার উন্মুক্ত হবে। মালয়েশিয়ার বিভিন্ন খাতের চাহিদা অনুযায়ী শ্রমবাজার খোলার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে দুই দেশ একমত। একই সঙ্গে একটি সুষ্ঠু, নৈতিক ও স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। বিগত ২০২২ সালের আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের মে মাস পর্যন্ত বাংলাদেশ মালয়েশিয়ায় পৌনে পাঁচ লাখ কর্মী পাঠায়। তাছাড়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা গতবছর আরব আমিরাত সফরে গিয়ে বলেছিলেন, জাল নথি, ভুয়া অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা সনদে বিদেশ যাওয়ায় বাংলাদেশিরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। বিদেশ গিয়ে মাথা হেট হয়। ওই অনিয়মের কারণে ইউরোপের দেশ রোমানিয়া, পোল্যান্ড, ক্রোয়েশিয়ার শ্রমবাজার প্রায় বন্ধের পথে। 

অন্যদিকে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টদের মতে, বন্ধ শ্রমবাজারগুলো খুলতে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা, যুদ্ধ পরিস্থিতির উন্নতি হলে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মী পাঠাতে যোগাযোগ এবং কর্মীদের কাজের ও ভাষাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে একযোগে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। শিগগির এর সুফল মিলবে। 

এ প্রসঙ্গে প্রবাসী কল্যাণের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানান, যুদ্ধের কারণে যেসব দেশে কর্মসংস্থান কমেছে, তাদের সঙ্গে আলোচনা ও সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রয়েছে। দেশগুলো আশ্বস্ত করেছে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে চাহিদা অনুযায়ী কর্মী নিয়োগ শুরু করবে। বাংলাদেশকে জোগান ঠিক রাখতে বলেছে।  আর ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গেও ভিসা সহজীকরণের বিষয়ে কথা বলা হচ্ছে। জাপানে যাওয়ার জন্য ভাষা ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে সরকার কাজ করছে। নতুন শ্রমবাজার খোঁজা হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়াসহ যেসব দেশের সঙ্গে অতীতে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল, সেগুলোকে কার্যকরে ফলোআপ করা হচ্ছে। মালয়েশিয়া, ওমানের মতো পুরোনো বাজারগুলো খুলতে এরই মধ্যে চেষ্টা শুরু হয়েছে। মালয়েশিয়া থেকে ইতিবাচক সাড়া এসেছে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে