দেশে গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে গভীর কূপ খননের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ওসব কূপে দেড় থেকে দুই ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সম্ভাব্য মজুত থাকতে পারে। যা দেশের জ্বালানি সংকটের মধ্যে নতুন আশা দেখাচ্ছে। প্রাথমিকভাবে পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে দেশের চারটি গ্যাসক্ষেত্রের চারটি কূপে এই খনন কাজ চালানোর। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস, কুমিল্লার বাখরাবাদ ও শ্রীকাইল এবং পাবনার সাঁথিয়ার মোবারকপুরে ওই গভীর কূপ খনন করা হবে। ইতিমধ্যে তিতাসে কূপ খনন শুরু হয়ে পুরোদমে কাজ চলছে। ওই পরিকল্পনার আওতায় বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি (বিজিএফসিএল) দুটি এবং বাপেঙ্ দুটি কূপ গভীর খনন করবে। ওই চারটি কূপ হচ্ছে বিজিএফসিএলের তিতাস-৩১ ও বাখরাবাদ-১১ নম্বর এবং বাপেঙ্রে শ্রীকাইল ও মোবারকপুর কূপ। পেট্রোবাংলা সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সাধারণত দেশে ২ হাজার ৬০০ থেকে ৪ হাজার মিটার গভীরতা থেকে গ্যাস উত্তোলন করা হয়। যদিও কিছু ক্ষেত্রে প্রায় ৪ হাজার ৯০০ মিটার পর্যন্ত খনন করা হয়েছে। কিন্তু এর নিচে শক্ত শিলা স্তর থাকলেও তারও নিচে গ্যাস থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। বাপেঙ্রে ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) জরিপে মিলেছে ওই আশার ইঙ্গিত। সেজন্য এবার ৬ হাজার মিটার পর্যন্ত কূপ খননের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, সামপ্রতিক বাপেঙ্রে সিসমিক জরিপে বড় ধরনের গ্যাস সম্ভাবনার ইঙ্গিত মিলেছে। ওই কারণেই তিতাস-৩১ ও বাখরাবাদ-১১ কূপে প্রায় ৫ হাজার ৬০০ মিটার পর্যন্ত খননের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। জরিপের তথ্যমতে শ্রীকাইল এলাকায় প্রায় ৯২৬ বিলিয়ন ঘনফুট এবং তিতাসে প্রায় ১ হাজার ৫৮৩ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মজুত থাকতে পারে। সব মিলিয়ে সম্ভাব্য মজুত দেড় থেকে দুই ট্রিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি হতে পারে। বিজিএফসিএল গত বছর প্রথমবারের মতো গভীর কূপ খনন করতে চীনা প্রতিষ্ঠান সিএনপিসি চুংগিংগ ড্রিলিং ইঞ্চিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেডের (সিসিডিসি) সঙ্গে চুক্তি সই করে। চুক্তির আওতায় তিতাস-৩১ কূপটি ৫ হাজার ৬০০ মিটার পর্যন্ত এবং বাখরাবাদ-১১ কূপটি ৪ হাজার ৩০০মিটার পর্যন্ত খনন করার পরিকল্পনা রয়েছে। আর ওই দুই কূপ খননে ৭৯৮ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। তার মধ্যে সরকারি ঋণ ৫৫৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং বিজিএফসিএলের নিজস্ব অর্থায়ন ২৩৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা। প্রকল্পের বাস্তবায়ন মেয়াদকাল ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
সূত্র আরো জানায়, তিতাস ও বাখরাবাদ গ্যাসক্ষেত্রে ২০১১-২০১২ সালে বাপেঙ্রে মাধ্যমে পরিচালিত ৩ডি সিসমিক জরিপ করা ডাটার ওপর ভিত্তি করে সম্ভাবনাময় কূপ দুইটি খননের পরিকল্পনা করা হয়েছে। জিওলোজিক্যাল এবং জিওফিজিক্যাল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রস্তুত করা জিওটেকনিক্যাল অর্ডার অনুযায়ী তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের অনাবিষ্কৃত উচ্চচাপ জোনের নিচে ৪টি স্তরকে এবং বাখরাবাদ ফিল্ডের অনাবিষ্কৃত উচ্চচাপ জোনের নিচে ২টি স্তরকে লক্ষ্য করে খনন করার পরিকল্পনা নেয়া হয়। কূপ দুটিতে চাপ প্রায় ১৫ হাজার পিএসআই (পাউন্ড পার স্কয়ার ইঞ্চি) এবং তাপমাত্রা প্রায় ৩৯০ ডিগ্রি ফারেনহাইট। যা বাংলাদেশে প্রথম উচ্চচাপ ও উচ্চ তাপমাত্রার কূপ হবে। নতুন স্তরে সফলভাবে খনন সম্পন্ন হলে দেশের গ্যাস খাতে নতুন দিগন- উন্মোচিত হবে এবং গ্যাসের মজুত বৃদ্ধি পাবে।
এদিকে এ বিষয়ে পেট্রো বাংলার চেয়ারম্যান এরফানুল হক জানান, গভীর কূপ খনন খুব ঝুঁকিপূর্ণ হলেও ওসব কূপে যে সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে তাতে গ্যাস নিশ্চিত হলে এখনকার যে জ্বালানি সংকট, তার অনেকটাই কেটে যাবে। সংকট কাটাতে ইতোমধ্যে ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভারের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিলো। তার মধ্যে ২৫টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভারের কাজ শেষ হয়েছে। সেসব কূপ থেকে সম্ভাব্য প্রতিদিন ২৪৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেতে পারে এবং বর্তমানে প্রতিদিন ১২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। তাছাড়া ভোলায় আরো ৫টি নতুন কূপ খননের উদ্যোগও নেয়া হয়েছে।