সাম্প্রতিক ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন ও হত্যার ঘটনাগুলো সমাজ ও রাষ্ট্রকে করেছে বধির। সব জায়গায় কেমন জানি সুনসান নীরবতা বিরাজ করছে। নিষ্পাপ রামিসাকে ধর্ষণ, গলা কেটে হত্যা, আর হত্যাকারীকে পারিয়ে যেতে সাহায্য করল ধর্ষণকারীর স্ত্রী, যে নিজেও একজন মা। শিশু রামিসার লাশ উদ্ধারের পর পিতার বিচার না পাওয়ার যে সংস্কৃতির কথা বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে যে প্রশ্ন করেছেন, তার কোনো জবাব কি রাষ্ট্র বা সরকার দিতে পারবে? চারদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নীরবতা নিয়েও চলছে নানা প্রশ্ন। কোনো প্রশ্নের উত্তর কি আছে?
এই শিশু ধর্ষণ, হত্যা, মাদ্রাসায় শিশু বলৎকার-এগুলো আসলে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং বহু বছর ধরে চলতে থাকা নৈতিক অবক্ষয়, সামাজিক দায়িত্বহীনতা এবং মানবিক মূল্যবোধের দ্রুত পতন, সরকার ও রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠিত বিচারহীনতার ভয়াবহ পরিণতি। গত ৫৫ বছরে এ ধরনের যত ঘটনা ঘটেছে, তার কয়টার বিচার করতে পেরেছে রাষ্ট্র? বরং কিছুদিন পরপর নতুন নতুন ঘটনার মধ্য দিয়ে পুরোনো ঘটনা চাপা পড়ে যায়। আমরা কয়েক দিন নানা কথা বলি, ফেসবুকে বিপ্লবী স্ট্যাটাস দিয়ে দায়িত্ব শেষ করি। এমন ঘটনাও ঘটেছে যে, বিচার না পেয়ে, নিরাপত্তা না পেয়ে, শেষ পর্যন্ত প্রাণ হারাতে হলো ধর্ষণের শিকার একটি কিশোরীকে। এই সকল ঘটনাকে সরকার বা রাষ্ট্র বিচ্ছিন্ন অপরাধ বলে পাশ কাটাতে পারে না; বরং এগুলো আমাদের রাষ্ট্রের বিচারহীনতা, সামাজিক নৈতিক অবক্ষয় এবং রাজনৈতিক-প্রশাসনিক দায়বদ্ধতার গভীর সংকটেরই প্রতিফলন।
শিশু ধর্ষণ, বলৎকার, পৈশাচিক নির্যাতন আর হত্যা এখন প্রায় মহামারির মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, দুর্বল ও অপ্রাসঙ্গিক আইন, শিশু সুরক্ষায় অপ্রতুল পুলিশি নিরাপত্তা, জটিল ও দীর্ঘ বিচারব্যবস্থা-এই সকল কিছু মিলিয়ে ভিকটিমরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে অধিকাংশই। ন্যায়বিচার তো দূরের কথা, অধিকাংশই বিচার পর্যন্ত গড়ায় কি না সন্দেহ। অপরাধীদের কঠোর শাস্তির আইন থাকলেও যৌন অপরাধীদের কেন্দ্রীয় ডাটাবেস এবং যথাযথ নজরদারি না থাকায় প্রতিরোধও করা সম্ভব হচ্ছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে। বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অপরাধীরা অর্থ, ক্ষমতা আর নিয়মের জটিলতা, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা কাজে লাগিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে। অবাক করার বিষয় হলো, আমাদের প্রচলিত আইনে যৌন নির্যাতনের শিকার মেয়ে শিশুরা কিছুটা সুরক্ষা পেলেও, বলৎকারের শিকার ছেলে শিশুরা যখন যৌন নির্যাতনের শিকার হয়, তখন তাদের জন্য আলাদা কোনো সম্মতির বয়স বা ধর্ষণের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা নেই। তবে দেশে ছেলে ও মেয়ে শিশু উভয়ই রয়েছে সমান ঝুঁকিতে।
একের পর এক শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় প্রমাণিত হচ্ছে, রাষ্ট্র আজ নাগরিকের জানমাল রক্ষায় চরমভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি, প্রশাসনের দলীয়করণ এবং ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় অপরাধীদের বেড়ে ওঠা-এই ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য দায়ী। দেশে আইনের শাসন ভেঙে পড়েছে। অপরাধীরা জানে, ক্ষমতার আশ্রয়ে তারা পার পেয়ে যাবে। ফলে শিশু থেকে নারী, কেউই নিরাপদ নয়। এটি শুধুমাত্র সামাজিক অবক্ষয় নয়; এটি সরকারের রাজনৈতিক ব্যর্থতা এবং নৈতিক দেউলিয়াত্বেরও বহিঃপ্রকাশ।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২,৮০৮ জন নারী ও কন্যা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৭৮৬ জন ধর্ষণের শিকার, যার ৫৪৩ জনই কন্যাশিশু। দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৭৯ জন; ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৩১ জনকে। এই পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যা নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি জীবন, একটি পরিবার, একটি অসমাপ্ত ভবিষ্যৎ। একই বছরে ৭৩৯ জন নারী ও কন্যাকে হত্যা করা হয়েছে। ২৩০ জনের রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। এই চিত্র আমাদের বলে দেয়-নারী ও কন্যাশিশুর নিরাপত্তা এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।
ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি। ধর্ষণ ও হত্যার শিকার রামিসার পিতা যখন বলেন, “আমি বিচার চাই না, আপনারা বিচার করতে পারবেন না”-একজন শোকাহত বাবার এই কথা কেবলমাত্র ব্যক্তিগত হতাশা নয়; এটি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার ওপর এক ভয়াবহ অনাস্থারই প্রতিধ্বনি। যে বাবা তার ছোট্ট মেয়ের ছিন্নভিন্ন মরদেহ দেখেছেন, যার বুকের ভেতর থেকে একসঙ্গে সন্তানহারা হওয়ার বেদনা ও রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাহীনতার শব্দ বেরিয়ে এসেছে। বরং ভয়াবহতার বিষয় হলো, আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র ও সরকার এই বাক্যের ভেতরে লুকিয়ে থাকা আর্তনাদকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে শুরু করেছি। এই সকল ঘটনার মামলার দীর্ঘসূত্রতা, প্রমাণ সংগ্রহে গাফিলতি, সাক্ষী সুরক্ষার অভাব, সামাজিক কলঙ্কের ভয়-সব মিলিয়ে ভুক্তভোগী পরিবার অনেক সময়ই আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে পারে না। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি বা রাজনৈতিক পরিচয়ধারীরা সালিশের নামে আপসের চাপ সৃষ্টি করেন। এতে অপরাধীরা বার্তা পায়, ক্ষমতা থাকলে শাস্তি এড়ানো সম্ভব। এই সংস্কৃতি ভাঙতে না পারলে কেবল আইন প্রণয়ন করে এই মহামারি থেকে বের হওয়ার উপায় নেই।
এই সকল ধর্ষণ, বলৎকার, হত্যা মনে প্রশ্ন সৃষ্টি করছে-এ কেমন সমাজ তৈরি করছি আমরা! যেখানে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার শিশু, আবার হন্তারকও আরেক শিশুর পিতা! একটা ঘটনা শেষ হতে না হতেই কাল হয়তো আরও একটি শিশু ধর্ষণ ও হত্যার খবর আসবে। শিশু হত্যা, খুন, ধর্ষণ, গুম-এসব কর্মকাণ্ডে বড়দের পাশাপাশি শিশু-কিশোররাও যুক্ত হচ্ছে। একটার পর একটা নৃশংস ঘটনা ঘটছে। সংস্কৃতির ভাঙন আর বিচারহীনতার সংস্কৃতি, অবাধে লুটপাট ও ক্ষমতার আধিপত্য-এই অপসংস্কৃতি দেখে দেখেই বড় হচ্ছে আমাদের শিশুরা। ভয়ে কুঁকড়ে যাওয়া আমাদের সমাজের কর্তা ব্যক্তিরাসহ সাধারণ মানুষ সকলেই ভাবছে, এতসব ভেবে লাভ নেই। নিজের সন্তান-পরিবার নিরাপদ থাকলেই তো হলো। কিন্তু আসলে কেউ কি নিরাপদ আছে বা নিরাপদে থাকবে? একটা ঘরে আগুন লাগলে তার হল্কা আশপাশেও পড়ে। চুপচাপ কপাট বন্ধ করে রাখলে আমরা কি আমাদের সন্তানদের নিরাপদ রাখতে পারব?
মানুষের মূল্যবোধ তৈরি ও গঠনে পরিবারের যেমন ভূমিকা রয়েছে, তেমনই সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালকদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। এখানে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও সরকার-সকলেই এই সকল ভূমিকা পালনে অনেকভাবেই ব্যর্থ হচ্ছে। যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করেন, তারা পরিবারেরই মানুষ। রাষ্ট্রের ভিতরে বৈষম্য, দুর্নীতি বেড়ে গেলে পরিবারেও তার প্রভাব পড়ে। পরিবার ও রাষ্ট্র কাঠামোগত দিক দিয়ে একই। পরিবারের দুর্নীতিগ্রস্ত একজন সদস্যই কিন্তু রাষ্ট্রের কোনো না কোনো কাঠামোর পরিচালক হয়ে থাকেন।
এই সকল অমানবিক অপরাধের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের পাশাপাশি একটি শক্তিশালী জাতীয় সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। অপরাধ দমনে শুধু আইন বা সরকারের উদ্যোগকে আরও বেশি কঠিন ও দ্রুত করতে হবে। বিচারহীনতা ও বিচারের দীর্ঘসূত্রতা দূর করতে হবে। শুধু আইন তৈরি নয়, আইনের প্রয়োগ করতে হবে যথাযথভাবে। শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তৈরি করতে হবে একটি শক্তিশালী জাতীয় সামাজিক আন্দোলন। পরিবার, বিদ্যালয়, মাদ্রাসা, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন এবং প্রতিটি নাগরিককে এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের সন্তানদের সম্মান, মানবিকতা, দায়িত্ববোধ ও নারীর মর্যাদা সম্পর্কে শিক্ষা দিতে হবে।
আমাদের আরও মনে রাখতে হবে, ন্যায়বিচার শুধুমাত্র আদালতের রায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি প্রক্রিয়া, যা শুরু হয় অভিযোগ গ্রহণের মুহূর্ত থেকে এবং শেষ হয় পুনর্বাসন ও সামাজিক স্বীকৃতিতে। আর কোনো রামিসা যেন না হয়, এটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব। এসব ঘটনা ঘটার পর যদি আমরা কেবল ক্ষোভ প্রকাশে সীমাবদ্ধ থাকি, তবে ভবিষ্যতে আরও এমন সংবাদ আমাদের সামনে আসবে এবং আসতেই থাকবে। রামিসা আর ফিরে আসবে না। তার ছোট্ট জীবনের নির্মম সমাপ্তি কোনো শাস্তিই পূরণ করতে পারবে না। কিন্তু তার মৃত্যু যদি আমাদের বিবেককে না জাগায়, যদি বিচারব্যবস্থা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে জাতীয় আত্মসমালোচনা তৈরি না করে, তবে আমরা আরও অনেক রামিসাকে হারাব। যদি আমরা বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙতে পারি, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তদন্ত নিশ্চিত করতে পারি এবং নারী-শিশুর নিরাপত্তাকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার দিই, তবে এই নির্মম মৃত্যুর ভেতর থেকেও পরিবর্তনের শক্তি জন্ম নিতে বাধ্য।
লেখক : কলাম লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক