ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের ভোগান্তির মধ্যে নতুন করে ৬৯০টি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত (এসি) বাস চলাচলের অনুমতি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক উদ্যোগ। যাত্রীসেবার মান উন্নয়ন, নিরাপদ ও আরামদায়ক যাতায়াত নিশ্চিত করা এবং আধুনিক পরিবহনব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে শুধু নতুন বাস নামালেই যে রাজধানীর পরিবহন সংকটের সমাধান হবে, বাস্তবতা তা বলে না। প্রয়োজন সুশৃঙ্খল, বিজ্ঞানভিত্তিক ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা। ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন রুটে আটটি কোম্পানিকে এসি বাস পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এসব বাসে অটো ডোর, ই-টিকেটিং, নির্ধারিত রং এবং কাউন্টারভিত্তিক সেবা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কন্ট্রাক্টভিত্তিক যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতা কমিয়ে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এই শর্তগুলো কার্যকর হলে যাত্রীরা কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন। তবে অভিজ্ঞতা বলছে, কেবল কাগজে-কলমে শর্ত আরোপ করলেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসে না। বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দুর্বল তদারকি ও অনিয়মই বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। রাজধানীতে এখনো বহু বাস নির্ধারিত রুটের বাইরে চলাচল করছে, আবার অনেক বাসের কোনো রুট পারমিটই নেই। ডিটিসিএর তথ্য অনুযায়ী, নিবন্ধিত বাসের বড় একটি অংশ নিয়মবহির্ভূতভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এই বাস্তবতায় নতুন রুট পারমিট দেওয়ার আগে বিদ্যমান বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি ছিল। পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতামতও গুরুত্বের দাবি রাখে। কোন রুটে কত যাত্রী, কোথায় কত সময় পরপর বাস প্রয়োজন, কোথায় স্টপেজ হবে-এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া নতুন বাস নামালে যানজট ও অব্যবস্থাপনা আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা শুধু ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, নগর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভাড়া কাঠামো। অতীতে এসি বাসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ ছিল। সরকার নির্ধারিত ভাড়ানীতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন না হলে সাধারণ যাত্রী আবারও ভোগান্তির শিকার হবেন। একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে যেন উন্নত সেবার নামে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য গণপরিবহন অপ্রাপ্য হয়ে না পড়ে। ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থার প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব হবে, যখন রুট রেশনালাইজেশন, ডিজিটাল টিকিটিং, শৃঙ্খলাবদ্ধ স্টপেজ ব্যবস্থা এবং কঠোর তদারকি একসঙ্গে কার্যকর হবে। নতুন এসি বাস সেই পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে, কিন্তু তা যেন শুধুই নতুন রঙের বাস যোগ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। রাজধানীর যাত্রীরা শুধু আরামদায়ক বাস নয়, নির্ভরযোগ্য, নিরাপদ ও শৃঙ্খলাপূর্ণ গণপরিবহন ব্যবস্থাই প্রত্যাশা করেন। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেই প্রত্যাশা কতটা বাস্তবে রূপ দিতে পারে।