পবিত্র ঈদুল আজহার সংস্কৃতি, সেকাল ও একাল

আল মামুন শায়েস্তাগঞ্জ, হবিগঞ্জ | প্রকাশ: ২৫ মে, ২০২৬, ০৯:১৬ পিএম
পবিত্র ঈদুল আজহার সংস্কৃতি, সেকাল ও একাল

মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহা। ত্যাগ, আত্মসমর্পণ, মানবতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের মহান শিক্ষা নিয়ে প্রতি বছর মুসলিম উম্মাহর জীবনে ফিরে আসে এই পবিত্র দিন। হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর মহান কোরবানির আদর্শকে স্মরণ করে মুসলমানরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে পশু কোরবানি করেন। তবে ঈদুল আজহা শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি বাঙালি মুসলিম সমাজের এক গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসবও বটে।

সেকালের ঈদুল আজহা ছিল অনেক বেশি আন্তরিক, পারিবারিক ও সমাজকেন্দ্রিক। গ্রামের মানুষ কয়েক মাস আগে থেকেই কোরবানির গরু বা ছাগল কিনে লালন-পালন করতেন। কোনো কোনো পরিবারে কোরবানির গরু আলাদা চিহিত করে সেটাকে আলাদা যত্ন নেওয়া হতো। পরিবারের শিশু-কিশোররা পশুর সঙ্গে মায়া ও আবেগের সম্পর্ক গড়ে তুলতো। পশুকে গোসল করানো, ভালো খাবার খাওয়ানো এবং যত্ন নেওয়া ছিল ঈদের আনন্দেরই অংশ। ঈদের দিন ভোরে সবাই গোসল করে পরিষ্কার বা নতুন পোশাক পরে ঈদের মাঠে যেতেন। নামাজ শেষে কোলাকুলি, কুশল বিনিময় ও বাড়ি বাড়ি ঘুরে শুভেচ্ছা জানানোর মধ্য দিয়ে সমাজে গড়ে উঠত সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যরে পরিবেশ।

তখন কোরবানির মাংস বণ্টনের মধ্যেও ছিল মানবিকতার ছোঁয়া। আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও দরিদ্র মানুষের মাঝে সমানভাবে মাংস বিতরণ করা হতো। অনেক গরিব পরিবার সারা বছরে এই সময়টাতেই ভালো খাবার খাওয়ার সুযোগ পেত। কোরবানির গরুর চামড়া বিক্রির অর্থ মাদরাসা, এতিমখানা ও গরিব মানুষের কল্যাণে ব্যয় করা হতো, অনেকেই সরাসরি সেই টাকা দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করতেন। এতে ঈদের আনন্দ সমাজের সব স্তরের মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়তো। সেকালের ঈদে ছিল লোকজ ঐতিহ্যেরও সমৃদ্ধ উপস্থিতি। ভাঙা কলসির অগ্রভাগে কোরবানির পশুর পর্দা (চামড়ার পাতলা অংশ) লাগিয়ে রোদে শুকিয়ে এক ধরনের লোকজ বাদ্যযন্ত্র তৈরি করা হতো। গ্রামের কিশোর ও তরুণরা তা বাজিয়ে আনন্দ করত। ঈদের মেলা, নাগরদোলা, লাঠিখেলা, কবিগান ও পালাগানের আয়োজন ঈদকে আরও বর্ণিল করে তুলত।

সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ঈদের খাদ্যসংস্কৃতিতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। আগে অনেক এলাকায় কোরবানির গরুর ভূঁড়ি বা কিছু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তেমন গুরুত্ব পেত না, তখন সেগুলো  ফেলে দেওয়া হতো। কিন্তু বর্তমানে গরুর ভূঁড়ি দিয়ে তৈরি বিভিন্ন সুস্বাদু খাবার অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এখন অনেক জায়গায় ভূঁড়ি সংগ্রহ করা নিয়েও আগ্রহ ও প্রতিযোগিতা দেখা যায়।

এই পরিবর্তন সমাজের রুচি, সচেতনতা ও খাদ্যসংস্কৃতির বিকাশের প্রতিফলন। আগে অবহেলিত অংশগুলো এখন পুষ্টিগুণ ও স্বাদের কারণে মূল্যবান হয়ে উঠেছে। টেলিভিশন, ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এই পরিবর্তনে বড় ভূমিকা রেখেছে। একই সঙ্গে নগরজীবনের বাস্তবতায় কোরবানির আয়োজনেও পরিবর্তন এসেছে। শহরে রাখার জায়গার অভাবের কারণে অনেকেই আগে থেকে গরু পালন বা ক্রয় করতে পারেন না। তাই ঈদের এক বা দুই দিন আগে পশু কেনার প্রবণতা বেড়েছে। অনেকেই আবার টাকার বিনিময়ে পেশাদার কসাই দিয়ে গরু জবাই ও মাংস প্রস্তুত করান। এতে কাজ দ্রুত সম্পন্ন হলেও আগের দিনের পারিবারিক মিলন ও একসাথে কাজ করার আনন্দ অনেকটাই কমে গেছে।

বর্তমান যুগে প্রযুক্তি ও নগরজীবনের প্রভাবে ঈদুল আজহার সংস্কৃতি অনেকটাই বদলে গেছে। অনলাইনে পশু কেনাবেচা, ডিজিটাল পেমেন্ট এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কোরবানি করার সুযোগ এখন সহজ হয়েছে। এতে সময় ও শ্রম সাশ্রয় হলেও পারিবারিক আবেগ কিছুটা কমে যাচ্ছে। শরীকের কোরবানির ক্ষেত্রে অংশীদার পেতেও আজকাল অনলাইন মাধ্যমে সহযোগিতা পাওয়া যায়। কেউ কেউ কোরবানির গরুর ছবি ফেসবুকে শেয়ার করেন।

ঈদের দিন বা ঈদের পর তরুণদের মধ্যে ঘোরাঘুরি ও বিনোদনের নতুন ধারা দেখা যায় ইদানিং । অনেক তরুণ দলবেঁধে মোটরসাইকেল বা খোলা যানবাহনে উচ্চ শব্দে গান বাজিয়ে ঘুরে বেড়ায়। একই রঙের পাঞ্জাবি - পায়জামার ব্যবহারও লক্ষ্য করা যায়। কোথাও কোথাও উশৃঙ্খলভাবে নাচ-গান ও প্রদর্শনমূলক আচরণও দেখা যায়, যা অনেক সময় জনশৃঙ্খলা ও সড়ক নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এবং সামাজিক নৈতিকতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

ঈদের ছুটিতে শহর অনেকটা ফাঁকা হয়ে পড়ে। এই সুযোগে কোথাও কোথাও চুরি-ডাকাতির মতো অপরাধ বাড়ে এবং সড়ক দুর্ঘটনায় অনেক মানুষ প্রাণ হারায়। ফলে আনন্দঘন ঈদ অনেক সময় শোকের ছায়ায় ঢেকে যায়। অতীতে এ ধরনের সমস্যা তুলনামূলকভাবে কম দেখা যেতো।

ঈদযাত্রার আরেকটি বড় সমস্যা হলো অতিরিক্ত ভাড়া আদায়। ঈদ উপলক্ষে পরিবহন খাতে অযৌক্তিক ভাড়া বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে ঈদের আনন্দের পাশাপাশি অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা বহন করতে হয়। তবে আধুনিক যুগের কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। এখন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসম্মত জবাই এবং পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে সচেতনতা বেড়েছে। প্রশাসনের উদ্যোগে নির্ধারিত স্থানে কোরবানি ও অনলাইন মাধ্যমে দরিদ্রদের মাঝে মাংস বিতরণের সুযোগও তৈরি হয়েছে।

ঈদুল আজহার মূল শিক্ষা হলো ত্যাগ, সংযম, মানবতা ও আল্লাহর প্রতি আনুগত্য। কেবল পশু কোরবানি নয়, মানুষের ভেতরের লোভ, অহংকার ও স্বার্থপরতাকেও কোরবানি দিতে হয়। সেকালের সরলতা, আন্তরিকতা ও সামাজিক বন্ধনের সঙ্গে একালের আধুনিকতা ও প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটাতে পারলেই ঈদুল আজহার প্রকৃত সৌন্দর্য রক্ষা করা সম্ভব। পাশাপাশি শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও নৈতিকতার প্রতি সচেতন থাকলে ঈদের আনন্দ হবে আরও অর্থবহ, নিরাপদ ও সবার জন্য কল্যাণকর।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে