মাহমুদা খাতুন চলতি বছর মেডিকেল কলেজের ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে পাশ করেছেন। সম্প্রতি ভর্তিও হয়েছেন জামালপুর সরকারি মেডিকেল কলেজে। তার ভর্তি রোল নম্বর- ১৩১০৪২৮। প্রথম বর্ষের ক্লাশও শুরু হয়েছে। কিন্তু বাবা একজন গ্রামের দোকানের চা বিক্রেতা। তাই ক্লাশ শুরু হলেও ক্লাশের বই ও স্কিলেটন (কঙ্কল) কেনা অতি জরুরি হলেও গরীব বাবা মাত্র ৬০ হাজার টাকার জোগার করতে না পারাই তা কিনে দিতে পারেনি এখনও।
মাহমুদার বাড়ি রাজশাহীর তানোর উপজেলার পাঁচন্দর ইউপির কৃষ্ণপুর গ্রামে। বাবা চা বিক্রেতা মাসুদ রানা ও মা সায়েরা বিবি একজন গৃহিণী। মাসুদ রানার কোন ছেলে নেই, দুই মেয়ে। এর মধ্যে মাহমুদা বড়। আর ছোট মেয়ে মিম খাতুন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়াশুনা করে। মাহমুদা খাতুন ২০২৩ সালে কৃষ্ণপুর উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ-৫। আর ২০২৫ সালে কৃষ্ণপুর আদর্শ মহিলা ডিগ্রি কলেজ হতে এইচএসসিতেও গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে।
বাবা মাসুদ রানা বলেন, মাহমুদা ছোট থেকেই পড়াশুনাই আগ্রহী। আমরা পড়া লেখা জানিনা। মেয়ে পড়ার আগ্রহ দেখে খেয়ে না খেয়ে গ্রামের প্রতিষ্ঠানে এইচএসসি পর্যন্ত পড়াছি। প্রাইভেট পড়ার টাকাও দিতে পারিনি ওই সময়ে। গরীবের মেয়ে হলেও তার চোখে মুখে স্বপ্ন ছিল ডাক্তারি পড়ার। তার মেধাশক্তি ও ইচ্ছার প্রতিফলন আল্লাহপাক কবুল করেছেন। মাহমুদার বাবা মাসুদ রানার মোবাইল নম্বর- ০১৭৯৬-৮৮১৪৪৯।
মাসুদ রানা বলেন, গ্রামে তার ছোট একটি চায়ের দোকান আছে। চা বিক্রি করে প্রতিদিন তার ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় হয়। এতে সংসার চালাতেই হিমশিম খেতে হয় তাকে। এতো স্বল্প আয় দিয়েই তিনি গ্রামের কলেজে মেয়েকে পড়ালেখা করাতে পেরেছেন। এখন মেডিকেলে চান্স পেয়েছে তার মেয়ে। ভর্তির সময় ১৩ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। সেই টাকাও ধার নিয়ে খরচ করা হয়েছে। ক্লাশ শুরু হয়েছে তার বই কিনতে লাগবে ২০ হাজার টাকা। সেই সাথে একটি স্কিলেটন (কঙ্কল) যার মুল্য ৪০ হাজার টাকা। এতো টাকা জোগার করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এছাড়াও প্রতি মাসে খাতা কলম ও হোস্টেলের খাওয়ার খরচ মাহমুদার লাগবে আরো ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা করে।
মাহমুদার মা সায়েরা বিবি কান্না কন্ঠে বলেন, আমাদের কোন সম্পতি নেই। যে বিক্রি করে মাহমুদাকে পড়ার খরচ জোগাবো। গ্রামে মাত্র দুই শতক জমি রয়েছে। সেখানে মাটি ও বেড়া দিয়ে ঘর বানিয়ে বাস করি। সংসারে অভাব অনটন লেগেই থাকে। মেয়েটি ছোট থেকে ধার্মিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে। সৃষ্টিকর্তার কাছে কান্না করেন, যেন পড়াশুনা করে বড় ডাক্তার হয়ে গ্রামের সাধারণ গরীব-দুঃখী মানুষের ফ্রি চিকিৎসা করতে পারে তার মেয়ে। মেয়ের ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয় এজন্য রাস্ট্রের সরকার ও দেশের বিত্তমানদের কাছে বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।
মাহমুদা খাতুন বলেন, প্রথম বর্ষের ক্লাশ শুরু হয়েছে। তাই গত এক সপ্তাহ আগে জামালপুর মেডিকেল কলেজে হোস্টেলে গিয়ে উঠেছেন। নিজের বই না থাকায় পড়াশুনায় বিঘ্ন ঘটছে। পাশাপাশি খারাপও লাগছে। এছাড়াও কলেজ কর্তৃপক্ষ আমাকে একটি স্কিলেটন (কঙ্কল) কিনতে বলেছেন। কিন্তু বাবা টাকার অভাবে এখনও কেনে দিতে পারেননি।
মাহমুদার প্রতিবেশি হেলাল উদ্দিন তিনি মুন্ডুমালা পৌরসভায় চাকুরি করেন। কথা হয় তার সাথে তিনি বলেন, মাহমুদা ছোট থেকে বাবার সংসারে শুধু অভাব-অনটনে বেড়ে উঠে। অন্যের বই ধার করে অনেক সময় পড়ালেখা করতে হয়েছে তাকে। তার বাবা মাসুদ রানা গ্রামে সকালে ও বিকালে চা বিক্রি করে। এছাড়াও অতি অভাবে মানুষের কামলা খাটেন। গ্রামে অনেক ধনী পরিবার থাকলে মেডেকেলে ভর্তির সুযোগ পাইনি। মাহমুদার পাশে সবাইকে দাড়ানো উচিৎ।
এব্যাপারে তানোর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) নাঈমা খান বলেন, মাহমুদা খাতুন মেডিকেল কলেজে ভর্তির বিষয়টি জানতাম না। এমন পরিবার থেকে মেডিকেলে ভর্তি শুধু তার পরিবারের একাই নয় পুরো তানোর উপজেলার সে গর্ভ। তার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পেলে জেলা প্রশাসক স্যারের সাথে কথা বলে কিছু আর্থিক সহযোগিতার ব্যবস্থা করা হবে। তবে, শুধু সরকারি সহায়তা নয়- এমন অদম্য মেধাবী শিক্ষার্থীর জন্য দেশের বিত্তবানদের এগিয়ে আসা প্রয়োজন। ই/তা