আটকে গেছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতি

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ১২ জুন, ২০২৬, ০৮:১০ এএম
আটকে গেছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতি

দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষকের তীব্র সংকট কাটাতে  সরাসরি নিয়োগের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। ওই লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)  পরীক্ষার প্রাথমিক প্রস্তুতিও শুরু করেছিল। কিন্তু আইনি জটিলতায় আটকে গেছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতি। ফলে সরাসরি নিয়োগ এবং পদোন্নতি দুই পথেই প্রধান শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে দেশের অর্ধেকের বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ই চলছে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক ছাড়া। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের ১ হাজার ১২২টি পদের বিপরীতে প্রায় ৭ লাখ চাকরিপ্রার্থী প্রধান শিক্ষক পদে আবেদন করে। এখন বিপুলসংখ্যক ওই পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা নেয়ার জন্য বড় অঙ্কের অর্থ ও প্রস্তুতির প্রয়োজন। শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের, প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান বজায় রাখতে এবং বিদ্যালয়গুলোতে চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনতে দ্রুত আইনি জটিলতা নিরসন জরুরি। সেক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশনা ও সরকারের বিশেষ উদ্যোগ ছাড়া সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং পিএসসি সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দেশে অনুমোদিত ৬৫ হাজার ৪৫৭টি প্রধান শিক্ষকের পদ রয়েছে। বর্তমানে তার বিপরীতে ৩৪ হাজার ১৫৯টি প্রধান শিক্ষকের পদই শূন্য। অর্থাৎ কোনো স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই দেশের অর্ধেকের বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। আর স্থায়ী প্রধান শিক্ষক না থাকায় মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে বিদ্যালয়গুলোর পাঠদান ও প্রশাসনিক কার্যক্রম। তাতে দেশের প্রায় এক কোটি শিক্ষার্থীর পড়াশোনা তদারকিতে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। বিশাল ওই শূন্য পদের বিপরীতে পিএসসির মাধ্যমে মাত্র ১ হাজার ১২২টি পদের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছিল। শূন্য পদের তুলনায় ওই বিজ্ঞপ্তি অত্যন্ত অপ্রতুল হলেও তাও এখন  অনিশ্চিত।

সূত্র জানায়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী প্রধান শিক্ষক পদের মোট শূন্য পদের ৮০ শতাংশ পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ করার নিয়ম রয়েছে। বাকি ২০ শতাংশ পদ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পূরণ করা হবে। গত বছর চূড়ান্ত করা হয় ওই বিধিমালা। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি পেতে হলে সহকারী শিক্ষক হিসেবে অন্তত ১২ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। একই সঙ্গে মৌলিক প্রশিক্ষণ ও চাকরি স্থায়ীকরণ সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সারা দেশে এমন হাজার হাজার যোগ্য সহকারী শিক্ষক রয়েছে। কিন্তু একটি চলমান মামলার কারণে মন্ত্রণালয় তাদের পদোন্নতি দিতে পারছে না। ফলে পদোন্নতির মাধ্যমে শূন্যপদ পূরণের প্রক্রিয়াতেও কোনো সুখবর নেই। বর্তমানে অনেক বিদ্যালয়েই জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকরা ভারপ্রাপ্ত হিসেবে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছে। তাতে তাদের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ পড়ছে। আর স্থায়ী পদ না থাকায় তারা পূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না।

সূত্র আরো জানায়, শিক্ষক সংকট কাটানোর লক্ষ্যে পিএসসি গত বছরের ৩১ আগস্ট ১ হাজার ১২২টি পদের জন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিল। শুরুতে বিজ্ঞপ্তিতে ২ হাজার ১৬৯টি পদের কথা বলা হলেও বিধিমালা সংশোধনের পর পদের সংখ্যা কমে ১ হাজার ১২২টিতে দাঁড়ায়। গত বছরের অক্টোবরে আবেদনের প্রক্রিয়া শেষ হয়। আর ওই সামান্য পদের বিপরীতে প্রায় ৭ লাখ চাকরিপ্রার্থী আবেদন করে। ওই হিসাবে প্রতিটি পদের জন্য গড়ে ৬২৪ জন প্রার্থীকে লড়াই করতে হবে। কিন্তু আবেদনের পর দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা হচ্ছে না। তাতে বাড়ছে চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে হতাশা। পিএসসির ওই নিয়োগ পরীক্ষা মোট ১০০ নম্বরের ভিত্তিতে হবে। তার মধ্যে ৯০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা নেয়া হবে। লিখিত পরীক্ষায় পাসের জন্য ন্যূনতম ৫০ শতাংশ নম্বর পেতে হবে। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণরা পরবর্তী ধাপে ১০ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে।

এদিকে শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা প্রসঙ্গে পিএসসির চেয়ারম্যান মোবাশ্বের মোনেম জানান, মে মাসে শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার ওপর আদালত থেকে একটি ৬ মাসের স্টে অর্ডার (স্থগিতাদেশ) এসেছে। ফলে ইচ্ছা করলেও পিএসসি এখন পরীক্ষাটি নিতে পারছে না। নিয়োগ পরীক্ষা শুরু করার আগে আদালতের বিষয়টি নিষ্পত্তি হতে হবে। তাছাড়া প্রায় সাত লাখ প্রার্থীর পরীক্ষা নিতে প্রাথমিকভাবে প্রায় ১১ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। এতো বিপুলসংখ্যক পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা ঢাকা কেন্দ্রে নেয়া একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। তবে পিএসসি সঠিক ও সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা নেয়ার সক্ষমতা ইতিমধ্যে প্রমাণ করেছে। আশা করা যায় আদালতেৎ বিষয়টি দ্রুত সুরাহা হলে পিএসসি পরীক্ষা নেয়ার তারিখ ঘোষণা করতে পারবে।

অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানান, মূলত আদালতের একটি মামলার কারণে পদোন্নতির প্রক্রিয়াটি থমকে আছে। আশা করা যায়, খুব দ্রুত সময়ের মধ্যেই আদালতের মামলার নিষ্পত্তি হবে। আর মামলার জট খুললেই সরকারের পক্ষে বড় আকারে পদোন্নতি দেয়া সম্ভব হবে। এই সংকট সমাধানে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে এবং দ্রুততই এর সমাধান হবে।