রাজধানীতে ছিনতাইকারীরা লাগামহীনভাবে অপরাধ কার্যক্রম চালাচ্ছে। পুলিশের নানা অভিযানেও তা নিয়ন্ত্রণে আসছে না। বরং দিন দিন ওই অপরাধীরা আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি পুলিশের বিরুদ্ধে ছিনতাইয়ের মামলা নিতে অনীহা দেখানোর অভিযোগ মিলছে। এমন পরিস্থিতিতে ছিনতাইয়ের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে রাজধানীবাসী। সুযোগ পেলেই সাধারণ মানুষের সর্বস্ব ছিনিয়ে নিচ্ছে ছিনতাইকারীরা। তখন কেউ বাধা দিলে অপরাধীরা গুলি করতেও দ্বিধা করছে না। বর্তমানে রাজধানীতে ৩ শতাধিক ছিনতাই স্পট রয়েছে। তবে হটস্পট ৫৫টি। ওসব হটস্পটে একের পর এক ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। গত তিন মাসে রাজধানীতে ৮৩টি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। আর মে মাসে মার্চ ও এপ্রিলের তুলনায় ছিনতাইয়ের সংখ্যা বেড়েছে। ভুক্তভোগী এবং পুলিশ বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, রাজধানীতে পুলিশের তৎপরতার মধ্যেও জ্যামিতিক হারে বাড়ছে ছিনতাইকারী ও ছিনতাইয়ের ঘটনা। পুলিশ গ্রেফতার করলেও অপরাধীরা সহজেই জামিনে মুক্ত হয়ে আবারো ছিনতাইয়ের নামছে। আর এখন ছিনতাইকারীরা আগ্নেয়াস্ত্র যত্রতত্র অহরহ মানুষের সর্বস্ব লুট করে নিচ্ছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, মামলা ও জামিনের প্রক্রিয়াগত টালবাহানা বন্ধ না হলে টানা যাবে না ছিনতাইকারীদের লাগাম। অতিসম্প্রতি মতিঝিলের শাপলা চত্বরে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে এক ব্যবসায়ীর টাকা ও ডলার ছিনিয়ে নেয়া হয়। কিন্তু পুলিশ এখনো ওই ঘটনার কোনো কূলকিনারা করতে পারেনি। যদিও পুলিশের পক্ষ থেকে মতিঝিলের ঘটনার পর তারবার্তায় রাজধানীর প্রতিটি থানায় কঠোর বার্তা দেয়া হয়েছে। ওই বার্তায় গোয়েন্দা নজরদারি, টহল, চেকপোস্ট বাড়ানোর পাশাপাশি তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তার করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি জামিনে থাকা দাগি আসামিদের তথ্য সংগ্রহ করে কেউ নতুন করে অপরাধে জড়ালে আইনের আওতায় আনতে বলা হয়েছে।
সূত্র জানায়, বর্তমানে রাজধানীতে তালিকাভুক্ত ১ হাজার ৩৮৭ ছিনতাইকারী তৎপর রয়েছে রয়েছে। তার মধ্যে রমনা বিভাগে ১৫২ জন, লালবাগে ১৫৯ জন, ওয়ারীতে ৩০৮ জন, মতিঝিলে ১৬৮ জন, তেজগাঁওয়ে ২৪০ জন, মিরপুরে ৫৩ জন, গুলশানে ৬৭ জন ও উত্তরায় ২৪০ জন দুর্র্ধষ ছিনতাইকারী রয়েছে। তাদের ৮০ শতাংশই এক থেকে সাতটি মামলার আসামি এবং একাধিকবার গ্রেপ্তার হলেও জামিনে বেরিয়ে আবারো ছিনতাইয়ে সক্রিয় হয়ে ওঠে। পাশাপাশি ছিনতাইয়ে প্রতিদিন যুক্ত নতুন নতুন মুখ। তারা সুযোগ পেলেই ভয়ংকর হয়ে উঠছে। যদিও রাজধানীতে ৬ মাস আগেও ৯৮৯ জন তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারী ছিলো। কিন্তু কয়েক মাসের ব্যবধানে ঢাকা মহানগরীতে ছিনতাইকারীর সংখ্যা প্রায় দেড় গুণ বেড়েছে। একই সাথে ছিনতাইয়ে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহারও। গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী বর্তমানে রাজধানীতে তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীদের বাইরেও হাজারের বেশি ছিনতাইকারী সক্রিয় রয়েছে। তাদের অনেকই ভাসমান কিশোর ও মাদকাসক্ত। সুযোগ পেলেই তারা ছুরি, চাপাতি অথবা সামুরাই নিয়ে ছিনতাই করছে।
সূত্র আরো জানায়, রাজধানীতে অনেক ছিনতাই ঘটনাই প্রকাশ পাচ্ছে না। কারণ মানুষ মোবাইল ও মানিব্যাগ খোয়ালে প্রায় সবাই হারানো জিডি দায়ের করে। তাছাড়া ছিনতাইয়ের মামলা নিতে পুলিশও অনীহা দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। পুলিশের হিসাবে চলতি বছরের এপ্রিলে রাজধানীতে ২৫টি ছিনতাই ঘটে। তার মধ্যে তেজগাঁওয়ে ৯টি, মতিঝিল, গুলশান ও ওয়ারীতে ৪টি করে এবং রমনা ও লালবাগে ২টি করে। ছিনতাইয়ের হটস্পট তেজগাঁওয়ে সবচেয়ে বেশি। তারপরই মতিঝিল ও ওয়ারী। রাজধানীতে ছিনতাইয়ের হটস্পট চিহ্নিতের পরেও ছিনতাই ঠেকাতে পারছে না পুলিশ। আর প্রতিকারের ক্ষেত্রে পুলিশের শীর্ষ মহল থেকে বারবার সহজেই মামলা নেয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে তা হচ্ছে না।
এদিকে রাজধানীতে ছিনতাইকারীদের বেশুমার তৎপরতা প্রসঙ্গে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন নজরুল ইসলাম জানান, ‘ছনতাইসহ যেকোনো অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সব সময় পুলিশের সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। অপরাধীদের নিয়মিত বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে গ্রেপ্তারও করা হচ্ছে। কিন্তু শতভাগ অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। ফলে গ্রেপ্তারের বাইরে থাকা ওই অপরাধীরা ঘটনা ঘটিয়ে বসে। আবার যারা গ্রেপ্তার হয় তারাও কিছুদিন পর জামিনে বেরিয়ে আবারো অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। তবে পুলিশ বাহিনী যতো দ্রুত সম্ভব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে যাচ্ছে। ডিএমপির সব থানায় কঠোর নির্দশনা দেয়া হচ্ছে। সক্রিয় ছিনতাইকারীদের আইনের আতায় আনা হবে। সেই সঙ্গে জামিনে থাকা অপরাধীদের বর্তমান পরিস্থিতি জানতেও কাজ করছে পুলিশ।