জাতীয় বাজেট একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং জনগণের জীবনমান উন্নয়নের অন্যতম প্রধান নীতিগত দলিল। প্রতি বছরের মতো ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটও দেশের অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য নিয়ে প্রণয়ন করা হয়েছে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় এই বাজেটের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কতটা স্বস্তি ফিরিয়ে আনা যায়।
বর্তমানে দেশের সাধারণ মানুষ যে সমস্যাটির মুখোমুখি সবচেয়ে বেশি হচ্ছেন, সেটি হলো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য। বাজারে প্রতিদিন চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, চিনি, ডিম, মাছ, মাংস, সবজি, দুধসহ প্রায় সব ধরনের খাদ্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষ তাঁদের মাসিক আয়ের বড় অংশ ব্যয় করছেন শুধু খাদ্য কেনার জন্য। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, যাতায়াত ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় সংকুচিত করতে হচ্ছে।
অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যস্ফীতি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও, যখন তা দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চমাত্রায় অবস্থান করে, তখন তা জনগণের জীবনমান, সঞ্চয়, বিনিয়োগ এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। গত কয়েক বছরে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্য ওঠানামা, ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিও উল্লেখযোগ্য চাপের মধ্যে রয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও মূল্যস্ফীতিকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে। বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, অতি মুনাফার প্রবণতা, মজুতদারি, অসাধু সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং কার্যকর বাজার তদারকির অভাব বহু ক্ষেত্রে পণ্যের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। অনেক সময় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও দেশের বাজারে তার সুফল ভোক্তারা পান না। বরং মাঝখানে বিভিন্ন স্তরে অযৌক্তিক মূল্য সংযোজনের কারণে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন।
২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছে। এটি অত্যন্ত সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। তবে বাজেটে লক্ষ্য নির্ধারণ করাই যথেষ্ট নয়; লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা, দক্ষ বাজার ব্যবস্থাপনা এবং সমন্বিত অর্থনৈতিক নীতি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু শুল্ক কমিয়ে বা কর অব্যাহতি দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কারণ, অনেক ক্ষেত্রে শুল্ক কমানোর সুবিধা ভোক্তার কাছে না গিয়ে ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত মুনাফায় পরিণত হয়। এজন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে।
নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও স্বচ্ছ করতে হবে। বর্তমানে কৃষক অনেক সময় ন্যায্যমূল্য পান না, অথচ ভোক্তাকে অতিরিক্ত দামে সেই পণ্য কিনতে হয়। এর অর্থ হলো, উৎপাদক ও ভোক্তার মাঝখানে অস্বাভাবিক মূল্য ব্যবধান তৈরি হয়েছে। এই ব্যবধান কমাতে কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ, কোল্ড স্টোরেজ, আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা, ডিজিটাল বিপণন এবং সরাসরি কৃষক-ভোক্তা সংযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।
বর্তমান সময়ে পরিবহন ব্যয়ও বাজারদর বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। মহাসড়কে চাঁদাবাজি, অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয়, যানজট এবং সরবরাহ ব্যবস্থার অদক্ষতা শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের ওপর প্রভাব ফেলে। তাই শুধু বাজার মনিটরিং নয়, লজিস্টিক ব্যবস্থার আধুনিকায়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, দেশের কৃষি এখনও খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি। কৃষক যদি উৎপাদন ব্যয় কমানোর সুযোগ পান, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, উন্নত বীজ, মানসম্মত সার, সেচ সুবিধা এবং কৃষি যান্ত্রিকীকরণে সরকারি সহায়তা পান, তাহলে খাদ্য উৎপাদন আরও বৃদ্ধি পাবে। খাদ্য উৎপাদন বাড়লে বাজারে সরবরাহও বাড়বে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে।
বর্তমান বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা আরও সম্প্রসারণের উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে বাস্তবে যেন প্রকৃত দরিদ্র, নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী, দিনমজুর, বয়স্ক, বিধবা, প্রতিবন্ধী এবং শহরের নিম্ন-মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী এসব সুবিধা পান, তা নিশ্চিত করতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, প্রকৃত উপকারভোগীরা বাদ পড়েন, আবার অযোগ্য ব্যক্তিরা সুবিধা ভোগ করেন। এই অনিয়ম বন্ধে ডিজিটাল তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।
বর্তমানে ডিজিটাল বাজার ব্যবস্থাও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। ই-কমার্স, অনলাইন মুদি বাজার এবং ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি করা সম্ভব। এতে ভোক্তারা তুলনামূলক কম দামে পণ্য ক্রয়ের সুযোগ পাবেন। সরকার যদি ডিজিটাল বাণিজ্যের জন্য স্বচ্ছ নীতিমালা বাস্তবায়ন করে, তাহলে বাজারে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতিও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাজারে অর্থ সরবরাহ, ঋণের সুদের হার, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা না গেলে শুধু বাজেট দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তাই আর্থিক নীতি ও রাজস্ব নীতির মধ্যে সমন্বয় অপরিহার্য।
জাতীয় বাজেটের প্রকৃত সফলতা উন্নয়ন প্রকল্পের সংখ্যা দিয়ে নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান কতটা উন্নত হলো, বাজারে মূল্য কতটা স্থিতিশীল থাকল এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কতটা বাড়ল, তার মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হবে। যদি চাল, ডাল, তেল, ডিম, মাছ, মাংস, সবজি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আসে, তাহলে এই বাজেট সত্যিকার অর্থেই জনকল্যাণমুখী বাজেট হিসেবে বিবেচিত হবে।
সরকারের আন্তরিক উদ্যোগ, কার্যকর বাজার তদারকি, কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স, কৃষি ও উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ভোক্তাবান্ধব নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ যেমন মূল্যস্ফীতি ও নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ, তেমনি এই চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলা করতে পারলে দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনেও ফিরে আসবে কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি।
লেখক : শিক্ষক, কবি, কলাম লেখক, সমাজসেবক ও সংগঠক