নির্বাচনের পর নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিন সাধারণত জনমতের প্রত্যাশা, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং নীতিগত অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সাম্প্রতিক গবেষণা প্রতিবেদন দেশের আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের চিত্র তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনে মার্চ ও এপ্রিল মাসে ৬০৫টি খুন, ১৯৬টি অপহরণ, ২৯৪টি ছিনতাই এবং ৯০টি ডাকাতির ঘটনার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, গণপিটুনি, কারা হেফাজতে মৃত্যু এবং সংখ্যালঘু ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। অপরাধের এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যা নয়; এর পেছনে রয়েছে নাগরিক নিরাপত্তা, আইনের শাসন এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয় হলো, রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের সক্রিয়তা এবং সংঘবদ্ধ অপরাধে তরুণদের সম্পৃক্ততা। যদি সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হয়, তাহলে এটি ভবিষ্যতে আরও বড় সামাজিক সংকটে রূপ নিতে পারে। তবে চিত্রের অন্য দিকও রয়েছে। টিআইবির পর্যবেক্ষণেই উঠে এসেছে যে, সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে এবং কিশোর গ্যাং, মাদক, সন্ত্রাস, সাইবার অপরাধ ও অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছে। মব সহিংসতা প্রতিরোধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ সমস্যা মোকাবিলায় উদ্যোগের ঘাটতি নেই; প্রশ্ন হচ্ছে, এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পাশাপাশি শিক্ষা খাত নিয়েও টিআইবির পর্যবেক্ষণ গুরুত্বের দাবি রাখে। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ১৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে অব্যাহতি এবং নতুন নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও স্বায়ত্তশাসন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জ্ঞানচর্চা ও স্বাধীন মতবিনিময়ের কেন্দ্র। সেখানে নিয়োগ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সুশাসনের মূল ভিত্তি হলো জবাবদিহিতা, আইনের সমান প্রয়োগ এবং নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তাই অপরাধ নিয়ন্ত্রণে শুধু অভিযান নয়, বিচারপ্রক্রিয়ার কার্যকারিতা বৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং সামাজিক অপরাধের উৎসগুলো চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান গ্রহণ জরুরি। একই সঙ্গে শিক্ষা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে স্বচ্ছতা ও মেধাভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের প্রথম ১০০ দিনের এই অভিজ্ঞতা একদিকে যেমন উদ্বেগের কারণ, অন্যদিকে তা প্রয়োজনীয় সংস্কার ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তাও বটে।