বঙ্গের রঙ্গে ভরা লোকের চিত্তে ফুটবলের সৌন্দর্য উপভোগের আলামত গরহাজির। তারা চায় পেনাল্টি সহযোগে হলেও আর্জেন্টিনাকে জিততে হবে, যেকোনো উপায়ে ব্রাজিলের হেক্সা মিশন হাসিল করতেই হবে, এবারের বিশ্বকাপ ট্রফি স্পেনকেই দিতে হবে কিংবা ফ্রান্স আরেকবার না পেলে কেমন হয়! নতুনদের তালিকায় নাম আনা বারণ? কারণ তারা কেপ ভার্দের ফুটবলের নান্দনিকতা উপভোগ করতে জানে না, কুরাসাওয়ের ফুটবলের সৌন্দর্য তাদের চোখে লাগে না। তারা তাদের সমর্থক দলের বল নিয়ে প্রতিপক্ষের গোলপোস্টের দিকের দৌঁড়কে হাততালি দিয়ে সমর্থন জানায়। বিপক্ষ দল যতই ভালো খেলুক, তাতে কারো মন কাড়ে না; বরং মন খারাপের রসদ জোগায়।
বাঙালির বিদেশি দলের জার্সি ও পতাকা-প্রেম যতটা মনের, তার চেয়ে বেশি ছবি ও সাজের! প্রতিযোগিতা এখানে প্রতিহিংসার চেয়েও ভয়ানক। কেবল দলকে সাপোর্টের নামে খুনোখুনি, মারামারি, লড়ালড়ি-সব চালু আছে। গোলের চেয়েও খোঁচার উৎসব জমকালো হয়! সেভেন আপের গল্প পানীয়জলের চেয়েও বেশিকিছু! রাত জেগে যারা খেলা দেখে না, তারাও আলোচনায় থাকার জন্য আক্রমণাত্মক কথা বলে। ফুটবলে যে যে দলকে সাপোর্ট করে, সে সে দলকে অন্ধের মতো সাপোর্ট করার প্রবণতা এখানে প্রবল। অন্যদের হারাতে যত কৌশল, তা এখানে চলছে। আমেরিকা-কানাডা ও মেক্সিকোতে চলতে থাকা বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার জন্য খানকাহে মান্নত হয়, মন্দিরে পূজা হয়! কেউ রোজা রাখে কি না জানি না; তবে বাপের বাড়ি বিক্রি করে রাস্তায় পতাকার রঙের কাপড় টানানোর খবর কোনো বানানো গল্প নয়!
দলকে অন্ধ সমর্থনের মনস্তাত্ত্বিক শুচিবাই কেবল ফুটবলের বেলায়? না। এটা তো কেবল চার বছর অন্তর তীব্রতর হয়ে উদয় হয়। এদের কাছেই রাজনৈতিক দল ধর্মের মতো হয়ে থাকে। যে দলকে সাপোর্ট করবে, তাদের কোনো অন্যায় এদের চোখে ধরা পড়বে না। বিরোধী পক্ষের কোনো গুণও এদের প্রশংসা পাওয়া তো দূরের কথা; রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ যে ভালো কিছু করতে পারে, গড়তে পারে, তা তাদের বিশ্বাসেই জায়গা পাবে না! যার বিরোধিতা করবে, কোনো কারণ ছাড়াই তার বিরুদ্ধে বলতে থাকবে। একই অন্যায়-পক্ষে হলে চুপ, বিপক্ষের বেলায় লাগাও আন্দোলন!
একটি বড় অংশের বাঙালি আর যাই হোক, সুন্দর ও সুস্থ মন নিয়ে ফুটবল খেলা উপভোগ করছে না। হাল-ফ্যাশনে গা ভাসাতে তারা ভিন্ন ভিন্ন দলের গোঁড়াপন্থি সাপোর্ট করছে। শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে এই রোগ সংক্রামক! আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল কিংবা অন্য কতিপয় দলের চেয়ে নবাগত কিংবা ছোট ছোট দল নান্দনিক ফুটবল উপহার দিলেও তাদের পক্ষে সমর্থকদের মন পাওয়া যাবে না। যাদের মাকসাদ কেবল ট্রফি, তাদের মরক্কোর প্রচেষ্টা, তুরস্কের লড়াই, জাপানের ভদ্রতা চোখে পড়বে না। তারা তাদের ফুটবলীয় প্রতিপক্ষকে অন্যপক্ষ দিয়েও ঘায়েল করার খায়েশ ছাড়বে না। এরা কারা? চিনেন? আপনার আশেপাশে আবার নেই তো?
ফুটবল বিশ্বকাপ উন্মাদনা ছড়ায়-সত্য। তবে আমাদের সমর্থনের ধরন পাগলামির পড়ন্ত সীমায়। আমরা সাকারের সৌন্দর্য উপভোগের চেয়ে খোঁচাখোঁচিতে বেশি ব্যস্ত। কথা ও আচরণ, গোল ও ফাউল দিয়ে প্রতিপক্ষের সমর্থকদের শায়েস্তা করাই আমাদের মানবজীবনের মাকসাদে-মঞ্জিল। আমরা যখন খেলা দেখতে বসি, তখন আমার অপছন্দের দলকে হারতে দেখার নিয়তেই বসি। তাদের পায়ে বল গেলে মেজাজ খারাপ হয়! ৯০ মিনিটের খেলাটাকে আমরা ৪৫ দিনের পরের ফলাফলের গণ্ডিতে আবদ্ধ করতে চাই বলেই ফুটবল আমাদের কাছে আর ফুটবল থাকে না; বরং প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা ও হেনস্তা করার অস্ত্র হয়ে ওঠে।
আশঙ্কার কথা, ফুটবলকে কেন্দ্র করে অনলাইনে এবং গাঁও-গ্রামের অফলাইনে জুয়ার মহারণ চলছে। সরকার ও সচেতন মহলকে এটা থামাতে হবে। ফুটবলের সৌন্দর্য উপভোগ এবং প্রজন্মকে নৈতিকভাবে রক্ষায় জুয়ার বিস্তার রোধ করতে না পারলে ফুটবলের সমর্থনকেন্দ্রিক সন্ত্রাস পারিবারিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক ও সামাজিক শৃঙ্খলা নষ্ট করবে। কোথাও আমরা কেন সভ্য-ভদ্র আচরণ করতে পারছি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। প্রত্যেক ব্যাপারেই আমাদের বাড়াবাড়ির চূড়ান্ত চলছে। অথচ চার বছর পরপর ফুটবল বিশ্বকাপ আসে সময়কে উপভোগ্য করাতে। অথচ আমরা সব সৌন্দর্য নষ্ট করে কেবল আমি এবং আমার দল ইউনিভার্সে টিকে থাকতে চাই!
গ্রামের মুরুব্বিদের ভাষায় বললে, ‘টিভিতে কি তোদের বাপ-খালু খেলে, তোরা এত উন্মাদ হস কেন?’ মোকসেদ কয়, ফুটবলের আবেগ বাবা-খালুর মায়ার চেয়ে কোনো অংশে কম আপন নয়! তবে যেকোনো ব্যাপারের সীমালঙ্ঘন ক্ষতিকর। লক্ষ করে দেখুন, আমরা এমনভাবে পক্ষ নিয়েছি, যা খুনোখুনির পর্যায়ে ধাবিত হচ্ছে।
ভিনদেশি দলকে সমর্থনের নামে আমরা জাতীয় পতাকা বিধিমালা ভঙ্গ করছি। সমর্থনের নামে কত অর্থের অপচয় চলছে, তা আর বলছি না। তবে কারো কারো ব্যবসাও দারুণ জমেছে। আমরা যেন ফুটবলের সৌন্দর্যের উপভোগে ফিরি। বাড়াবাড়ি করে বিশ্বকাপ ট্রফি ভাগাভাগি করা যাবে না। আমি যদি বলি, এবারের দাবিদার কেপ ভার্দে, তবে কি তুমি রাগ করবা?
আমি আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলকে কাপ দেবো বলে ফুটবল খেলা দেখতে বসি না! আমরা কখনোই দুই দলের খেলা উপভোগ করতে পারি না বা চাই না। আমরা যেকোনো একটিকে বেছে নিই। শক্তিমানের জন্য থাকে প্রকাশ্য জনমত, আর দুর্বলের প্রতি সহমর্মিতা! এভাবেই এগিয়ে চলছে ফুটবল; তবে পিছিয়ে পড়ছি আমরা। সর্বশেষ প্রকাশিত ফিফা র্যাংকিং অনুযায়ী বাংলাদেশ পুরুষ ফুটবল দল ১৮১তম স্থানে রয়েছে। যেদিন বাংলাদেশ ফুটবল বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করবে, সেদিন কেবলই আমি বাংলাদেশের পক্ষ নেবো। সেদিন, সেই সুদিন কবে আসবে?
লেখক : প্রাবন্ধিক