একটি নগরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত বাজার বা মার্কেট শুধু ব্যবসা-বাণিজ্যের স্থান নয়; এটি স্থানীয় অর্থনীতি, নগর ব্যবস্থাপনা এবং জনসেবার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বগুড়া শহরের ঐতিহ্যবাহী সপ্তপদী মার্কেটকে ঘিরে যে চিত্র সামনে এসেছে, তা কেবল একটি মার্কেটের সমস্যা নয়; বরং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের দুর্বলতা, রাজস্ব ব্যবস্থাপনার অদক্ষতা এবং জবাবদিহির ঘাটতির প্রতিফলন। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, পৌরসভার মালিকানাধীন এই মার্কেটের অধিকাংশ দোকান দীর্ঘদিন ধরে সাবলেটের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। নামমাত্র ভাড়ায় বরাদ্দপ্রাপ্তরা বহুগুণ বেশি ভাড়ায় দোকান হস্তান্তর করে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হলেও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান হিসেবে পৌরসভা-বর্তমানে সিটি করপোরেশন-সেই আয়ের ন্যায্য অংশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে জনসম্পদের সুবিধা ভোগ করছেন অল্পসংখ্যক ব্যক্তি, আর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নগরবাসীর সামষ্টিক স্বার্থ। বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক কারণ এটি কোনো সাম্প্রতিক ঘটনা নয়। বছরের পর বছর ধরে চলমান এই ব্যবস্থায় একদিকে রাজস্ব আয় কমেছে, অন্যদিকে মার্কেটের অবকাঠামোগত উন্নয়নও থমকে আছে। বর্তমানে জরাজীর্ণ ভবন, অপরিকল্পিত দোকান সম্প্রসারণ এবং চলাচলের সংকট সাধারণ ক্রেতা ও পথচারীদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করেছে। অতীতে ভবনের অংশ ভেঙে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। তবুও কার্যকর উদ্যোগের অভাব প্রশ্নের জন্ম দেয়। এখানে সরকারি সম্পত্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ও আধুনিক ভাড়া ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। বাজারমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন ভাড়া এবং দীর্ঘমেয়াদি আইনি জটিলতা স্থানীয় সরকারের আর্থিক সক্ষমতাকে দুর্বল করে। এছাড়াও জননিরাপত্তার স্বার্থে জরাজীর্ণ ভবনের অবস্থা দ্রুত মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় সংস্কার বা পুনর্র্নিমাণের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সাবলেটের মাধ্যমে ব্যক্তি পর্যায়ে বিপুল অর্থ লেনদেন হলেও সিটি করপোরেশন তার প্রাপ্য রাজস্ব পাচ্ছে না-এমন পরিস্থিতি চলতে পারে না। একই সঙ্গে দোকান বরাদ্দ, ভাড়া আদায়, আদালতে জমা হওয়া অর্থ এবং প্রকৃত ব্যবহারকারীদের তথ্য নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ নিরীক্ষা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও অসঙ্গতির প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে। নবগঠিত বগুড়া সিটি করপোরেশনের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। নগর উন্নয়ন শুধু নতুন প্রকল্প গ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বিদ্যমান সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সপ্তপদী মার্কেটকে কেন্দ্র করে যে রাজস্ব ক্ষতি ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে, তা নিরসনে দ্রুত, স্বচ্ছ ও জনস্বার্থভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। এতে যেমন নগরবাসী নিরাপদ ও আধুনিক সেবা পাবে, তেমনি সিটি করপোরেশনের আর্থিক ভিত্তিও আরও শক্তিশালী হবে।