উগ্রতার রাজনীতি ও ভাঙা সম্প্রীতি

রাজু আহমেদ | প্রকাশ: ২৬ জুন, ২০২৬, ০২:১০ পিএম
উগ্রতার রাজনীতি ও ভাঙা সম্প্রীতি

নামাজ পড়তে হলে বাংলাদেশ বা পাকিস্তানে গিয়ে আদায় করো-এমন মন্তব্য করেছেন বিজেপির এক বিধায়ক। তবে এই মনোভাব বিজেপির অনেকের মধ্যেই দেখা যায়। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও এ বছর পশ্চিমবঙ্গে কয়েক হাজার মুসলিম কোরবানি দিতে পারেননি। এই যন্ত্রণার শেষ কোথায়? তবে সব গল্পেরই একটি পরিসমাপ্তি আছে-হয় মিলনের, নয় বিরহের।

সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা যে কোনো নির্দিষ্ট দেশের সীমানা মানে না, এটি সব পক্ষের বোঝা উচিত। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থানের পর মুসলিমদের ওপর, বিশেষ করে ‘বাংলাদেশি মুসলিম’ তকমা দেওয়া মানুষদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ বেড়েছে। কোথাও শারীরিক, কোথাও মানসিক-এই যন্ত্রণা মানবিক বোধসম্পন্ন মানুষের সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়। লক্ষণগুলো বলছে, শুভেন্দু অধিকারী এবং তার রাজনৈতিক অবস্থান এই পরিস্থিতিকে আরও উসকে দিচ্ছে।

বিজেপির আগে পশ্চিমবঙ্গে যারা শাসন করেছে, তারাও হিন্দু সম্প্রদায়েরই ছিল। কিন্তু বিজেপির হিন্দুত্ববাদ এবং তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক দর্শনের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। উগ্রবাদী হিন্দুত্ববাদের যে রাজনীতি বিজেপি ক্রমশ জোরালো করছে, তার প্রভাব যে সমাজজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে, তা তারা হয়তো অনুধাবন করছে না। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, ঘৃণা ও সহিংসতার মূল্য শেষ পর্যন্ত রক্ত দিয়েই দিতে হয়।

ময়ুখ রঞ্জনের মতো বিতর্কিত ব্যক্তিদের ভাষার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক নেতৃত্বের কিছু বক্তব্যের মিল খুঁজে পাওয়া যায়। যে বক্তব্য সমাজে বিভাজন বাড়ায়, তা কোনো দায়িত্বশীল নেতার মুখে শোভা পায় না। যারা সমাজে বিদ্বেষের আগুনে আরও জ্বালানি ঢালে, মানবতার ইতিহাস তাদের ইতিবাচকভাবে স্মরণ করে না।

এই উপমহাদেশে হিন্দু-মুসলমানের সহাবস্থানের ইতিহাস বহু শতাব্দীর। মুসলিম শাসনামলে হিন্দুরা গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেছেন, আবার হিন্দু শাসনের সময়ও মুসলমানরা নিরাপদে বসবাস করেছেন। কিন্তু অখণ্ড হিন্দুত্ববাদের যে রাজনৈতিক স্বপ্ন দেখিয়ে বিজেপি ক্ষমতা ধরে রাখতে চাইছে, তা সমাজে বিভাজন ও উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। এর পরিণতি শুভ হওয়ার সম্ভাবনা কম। রক্ত যারই ঝরুক, তার রং একই থাকে।

যে কোনো সমাজে মানুষ যদি স্বাধীনভাবে ধর্ম পালন করতে না পারে, যদি ব্যক্তি স্বাধীনতা সংকুচিত হয়, তাহলে সেখানে অসন্তোষ, অস্থিরতা ও গুপ্ত সহিংসতা বাড়ে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গনে মুসলিম ও বাংলাদেশবিরোধী কিছু বক্তব্য সীমান্তবর্তী অঞ্চলের সম্পর্ককেও প্রভাবিত করতে পারে। দীর্ঘদিনের সুসম্পর্কে ফাটল ধরার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

মানুষ হিসেবে আমাদের প্রয়োজন শান্তি। ধর্ম যদি শান্তির পরিবর্তে বিদ্বেষের উৎসে পরিণত হয়, তাহলে সেখানে ধর্মের চেয়ে রাজনৈতিক স্বার্থই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। প্রকৃত ধর্ম মানবকল্যাণ ও শান্তির কথা বলে। কিন্তু যারা ভোটের রাজনীতিতে ধর্মকে বিভাজনের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, তারা সমাজকে বিপজ্জনক পথে ঠেলে দেয়।

পশ্চিমবঙ্গের উগ্রতা যদি বাংলাদেশেও সংক্রমিত হয়, তবে তা অত্যন্ত দুঃখজনক হবে। সীমান্তের ওপারের উত্তেজনা এপারেও প্রভাব ফেলতে পারে। মানবসমাজে প্রতিশোধপরায়ণতা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে শুভবোধ অনেক সময় পিছিয়ে যায়। বিজেপির এই ধারার রাজনীতি বাংলাদেশের ভেতরেও ভারতবিরোধী মনোভাবকে উসকে দিতে পারে, যা প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর।

শুভেন্দু অধিকারীকে সতর্ক করার দায়িত্ব যাদের, তাদের অনেকেই একই রাজনৈতিক ধারার অংশ। সমালোচকদের মতে, নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক উত্থানের পেছনেও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার ইতিহাস রয়েছে। হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের পর এখন হিন্দু সমাজের ভেতরেও বিভাজনের রাজনীতি দেখা যাচ্ছে। এটি হয়তো সাময়িক রাজনৈতিক সুবিধা দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সমাজ ও সভ্যতার ওপর গভীর ক্ষতচিহ্ন রেখে যাবে।

মানুষ যখন অন্য মানুষকে ক্ষমতার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে, তখন তার ক্ষতি শুধু একটি গোষ্ঠীর নয়, সমগ্র মানবসমাজের ওপরই আঘাত হানে। এমন অন্ধকার তৈরি হয়, যা দূর করতে বহু বছর সময় লাগে।

এখনই না থামলে সামনে আরও বড় বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। সম্প্রীতি রক্ষা করতে হলে সব পক্ষের আন্তরিক অংশগ্রহণ প্রয়োজন।

লেখক : প্রাবন্ধিক