এবার ভয়াবহ রূপ নিতে পারে ডেঙ্গু

এফএনএস এক্সক্লুসিভ
| আপডেট: ২৮ জুন, ২০২৬, ১১:৩২ এএম | প্রকাশ: ২৮ জুন, ২০২৬, ১১:৩২ এএম
এবার ভয়াবহ রূপ নিতে পারে ডেঙ্গু

দেশে ডেঙ্গু এবার ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। ইতিমধ্যে বর্ষা মৌসুম শুরু হতেই আবারো দেশে ডেঙ্গু জ্বর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করেছে। বাড়তে শুরু করেছে রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। প্রতিদিনই হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হচ্ছে নতুন নতুন রোগী। চলতি বছরের প্রথম কয়েক মাস ডেঙ্গুর প্রকোপ তুলনামূলকভাবে কম থাকলেও আক্রান্তের সংখ্যা মে মাসের শেষ দিক থেকে বাড়তে শুরু করেছে। আর জুনে বর্ষার বৃষ্টিপাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এডিস মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হওয়ায় দ্রুত বাড়ছে সংক্রমণ। বর্তমানে রাজধানীর পাশাপাশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হচ্ছে চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, কক্সবাজার, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এখনই কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে চলতি মৌসুমে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে. বর্তমানে দেশের প্রায় সব অঞ্চলেই বিস্তার ঘটেছে এডিস মশার। ফলে গ্রামাঞ্চলেও বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা। চলতি বছরে ইতিমধ্যে দেশে ৩ হাজার ৮৪৪ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে আর ৬ জন  মারা গেছে। বর্তমানে রাজধানীর সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ধীরে ধীরে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। এবার মৌসুমের শুরুতেই উদ্বেগজনক অবস্থায় ডেঙ্গু প্রবণতা। আর জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাধারণত সবচেয়ে বেশি থাকে ডেঙ্গুর সংক্রমণ। এখন অনেকেই জ্বর, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীর ও গিঁটে ব্যথা এবং বমির উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসছে। আর পরীক্ষায় তাদের একটি অংশের ডেঙ্গু শনাক্ত হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট নয়। বরং এক্ষেত্রে মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, সিটি করপোরেশন এবং সাধারণ জনগণকে একযোগে কাজ করতে হবে।

সূত্র জানায়, চলতি বছর দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি গত বছরের তুলনায় আরো খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ ঢাকার বেশির ভাগ এলাকায় এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব পরিমাপের সূচক ‘ব্রুটো ইনডেঙ্’ ২০-এর ওপরে রয়েছে। কোনো কোনো এলাকায় ওই সূচক ৯৩ পর্যন্ত পাওয়া গেছে। সাধারণত ২০-এর বেশি হলেই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ধরা হয়। বর্তমানে চট্টগ্রাম, বরিশাল, পিরোজপুর, চাঁদপুর, নরসিংদী, গাজীপুর, মানিকগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়ছে। দক্ষিণাঞ্চল, কঙ্বাজার ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক। কিন্তু কার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে না মশা নিয়ন্ত্রণের কাজ। ডেঙ্গু পরিস্থিতি আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। আর ওই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাড়ি বাড়ি গিয়ে এডিস মশার লার্ভা অনুসন্ধান, প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত লার্ভিসাইড প্রয়োগ এবং পর্যাপ্ত কীটনাশক সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। মূলত বাসাবাড়ির ফুলের টব, এসির ট্রে, পরিত্যক্ত টায়ার, ডাবের খোসা, প্লাস্টিকের পাত্র কিংবা জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে এডিস মশা ডিম পাড়ে। সেজন্য সপ্তাহে অন্তত এক দিন বাসাবাড়ি ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার করা জরুরি। ডেঙ্গুতে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন এমন ব্যক্তিরা রয়েছে বেশি ঝুঁকিতে। দ্বিতীয়বার ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে গুরুতর ডেঙ্গু বা ডেঙ্গু হেমোরেজিক জ্বর হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে।

সূত্র আরো জানায়, বিগত ২০০০ সালে দেশে প্রথম বড় আকারে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। তারপর থেকে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছেই। ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা ও মশক নিধনে সরকারের শত শত কোটি টাকারও বেশি ব্যয় হলেও দৃশ্যমান ফল নেই। উল্টো প্রতি বছরই দীর্ঘ হয় মৃত্যুর মিছিল। বিগত ২০২৩ সালে ডেঙ্গুত রেকর্ড এক হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়। তবে বিগত ২০২৪ সালে তা ৫৭৫ জন এবং ২০২৫ সালে ৪১৩ জনে নেমে আসে। যদিও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন গত ৯ বছরে মশক নিধন, ওষুধ ও যন্ত্রপাতি কেনা বাবদ সরকারের ব্যয় ৭০০ কোটিরও বেশি টাকা করেছে। এমনকি সামপ্রতিক বাজেটগুলোতেও মশক নিধনের জন্য শত শত কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। তাছাড়া ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় সরকারি হাসপাতালগুলোতে জনপ্রতি ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। শুধু ২০২৩ সালেই সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় সরকারের ৪০০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছিল। আর দক্ষ জনবল ও উপকরণের অভাবে সরকারকে প্রতি বছরই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ নতুন করে শূন্য থেকে প্রস্তুতি শুরু করতে হয়। বিগত ২৭ বছর ধরে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে বাজেট ও ব্যয় বাড়লেও তা নিয়ন্ত্রণে আসেনি। 

এদিকে দেশে ডেঙ্গুবিরোধী নিবিড় কার্যক্রম কেবল ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনেই বেশি সীমাবদ্ধ থাকে। সারা দেশের অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোতে তা সমভাবে হচ্ছে না। ফলে ঢাকায় ডেঙ্গু কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও ঢাকার বাইরে সারা দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে। তাছাড়া সিটি করপোরেশন রাস্তাঘাট বা বাড়ির আশেপাশে ওষুধ ছেটাতে পারলেও ঘরের ভেতরে গিয়ে কাজ করতে পারে না। কিন্তু এডিস মশা ও লার্ভা সবচেয়ে বেশি ঘরের ভেতরেই জন্মায়।  ডেঙ্গু পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে শুধু সরকারের ওপর ভরসা না করে সবচেয়ে বেশি জরুরি জনসচেতনতা। মূলত সারা দেশে একইভাবে ডেঙ্গুবিরোধী কাজ পরিচালনা করা এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল ডেঙ্গুমুক্ত সমাজ গঠন করা সম্ভব। কারণ ডেঙ্গুর কোনো কার্যকর গণ-টিকা না থাকায় প্রতিরোধই একমাত্র পথ। আর তা একা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। বরং সরকার ও জনগণকে যৌথভাবে প্রতিরোধে এগিয়ে আসতে হবে।

অন্যদিকে দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, ডেঙ্গুর সম্ভাব্য প্রকোপ থেকে জাতিকে রক্ষা করতে দেশজুড়ে চিরুনি অভিযান, ভ্রাম্যমাণ আদালত এবং চিকিৎসার বিশেষ প্রটোকলসহ ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যে সারা দেশে কাজ শুরু করবে মোবাইল টিম। কোনো বাসা-বাড়ি বা প্রতিষ্ঠানে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেলে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা ও জরিমানা করা হবে। এবার পরিত্যক্ত ওয়াশরুম, ছাদ ও গ্যারেজে জমে থাকা পানিতে মশার লার্ভা ধ্বংসে বিশেষ রাসায়নিক ব্যবহার করা হবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে