কার্নিশে ঝুলে থাকা তরুণকে গুলি

সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবসহ ৩ পুলিশের মৃত্যুদণ্ড, একজনকে যাবজ্জীবন

নিজস্ব প্রতিবেদক
| আপডেট: ২৮ জুন, ২০২৬, ০৩:৩৮ পিএম | প্রকাশ: ২৮ জুন, ২০২৬, ১২:৫৬ পিএম
সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবসহ ৩ পুলিশের মৃত্যুদণ্ড, একজনকে যাবজ্জীবন

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরায় নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা এক তরুণকে গুলি করা এবং একই দিনে আরও দুজনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই মামলায় একজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং আরেকজনকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ঘিরে মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পঞ্চম রায় ঘোষণা হলো।

রোববার (২৮ জুন) দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এই রায় ঘোষণা করেন। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তিনজন হলেন ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, ডিএমপির খিলগাঁও অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মো. রাশেদুল ইসলাম এবং রামপুরা থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মশিউর রহমান। তাদের সবাই পলাতক।

রামপুরা থানার সাবেক উপপরিদর্শক (এসআই) তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়াকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে দেওয়া হয়েছে ২০ বছরের কারাদণ্ড। পাঁচ আসামির মধ্যে একমাত্র চঞ্চল আদালতে উপস্থিত ছিলেন। বাকি চারজন পলাতক থাকায় তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বহাল রয়েছে।

সরাসরি সম্প্রচারিত হলো রায় ঘোষণা
এদিন সকাল থেকেই ট্রাইব্যুনালে ছিল বাড়তি নিরাপত্তা। বেলা ১১টা ৩৫ মিনিটে একমাত্র গ্রেপ্তার আসামি চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে আদালতে আনা হয়। এরপর ১১টা ৪৮ মিনিটে রায় পাঠ শুরু হয়।

রায় ঘোষণার শুরুতেই প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) সরাসরি সম্প্রচারের অনুমতি চান। ট্রাইব্যুনাল অনুমতি দিলে রায়ের কার্যক্রম বিটিভিতে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।

প্রথমে চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মামলার আসামিদের দায় পড়ে শোনান। পরে বিচারক মোহিতুল হক এনাম অভিযোগগুলো পাঠ করেন। রায়ের মূল অংশ ঘোষণা করেন বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ।

যেসব অভিযোগে বিচার
এই মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে তিনটি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়।

প্রথম অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের শুক্রবার (১৯ জুলাই) দুপুরে রামপুরার বনশ্রী এইচ ব্লকে এলোপাতাড়ি গুলিতে নাদিম হোসেন নিহত হন।

দ্বিতীয় অভিযোগ ছিল একই দিনে নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা ১৮ বছর বয়সী আমির হোসেনকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি করে গুরুতর আহত করার ঘটনা।

তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়, সেদিন বিকেলে বনশ্রী এলাকায় পুলিশের ছোড়া একটি গুলি শিশু বাসিত খান মুসার মাথা ভেদ করে তার দাদি মায়া ইসলামের শরীরে বিদ্ধ হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মায়া ইসলাম মারা যান। গুরুতর আহত হয় শিশু বাসিত।

যেভাবে ঘটেছিল কার্নিশে ঝুলে থাকা তরুণকে গুলির ঘটনা
প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার (১৯ জুলাই) ছাত্র জনতার আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলির মুখে প্রাণ বাঁচাতে আমির হোসেন বনশ্রী মেরাদিয়া সড়কের পাশে একটি নির্মাণাধীন ভবনে আশ্রয় নেন।

পুলিশ তার পিছু পিছু ভবনে উঠে যায়। একপর্যায়ে জীবন বাঁচাতে ভবনের কার্নিশের রড ধরে ঝুলে থাকেন তিনি। অভিযোগ অনুযায়ী, নিচে লাফ দিতে বলা হলেও তিনি তা না করলে পুলিশ সদস্যরা পরপর ছয় রাউন্ড গুলি চালায়। সবগুলো গুলিই তার দুই পায়ে লাগে। গুরুতর আহত হলেও তিনি প্রাণে বেঁচে যান।

এই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং পরে তা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম আলোচিত প্রতীকী দৃশ্যে পরিণত হয়।

আমির হোসেন আদালতে যা বলেছিলেন
২০২৫ সালের বৃহস্পতিবার (২৩ অক্টোবর) ট্রাইব্যুনালে প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন আমির হোসেন।

তিনি বলেন, জুমার নামাজের পর কর্মস্থল থেকে রামপুরায় ফুফুর বাসায় ফিরছিলেন। পথে পুলিশ ও বিজিবির গুলির মুখে পড়ে প্রাণ বাঁচাতে একটি নির্মাণাধীন ভবনে ওঠেন।

তার ভাষ্য, "আমি ছাদের রড ধরে ঝুলে ছিলাম। পুলিশ আমাকে নিচে লাফ দিতে বলে। আমি ভয় পেয়ে ঝাঁপ দিইনি। তখন একজন পুলিশ সদস্য পরপর তিনটি গুলি করেন। পরে আরেকজন এসে আরও তিনটি গুলি করেন। সবগুলো গুলি আমার পায়ে লাগে।"

জবানবন্দিতে তিনি ফেমাস হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ফরাজী হাসপাতাল, টঙ্গি আহছানিয়া হাসপাতাল, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট এবং পরে সাভারের সিআরপিতে দীর্ঘ চিকিৎসার কথাও তুলে ধরেন। আদালতের কাছে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন তিনি।

শিশুর মাথা ভেদ করে দাদির মৃত্যু
মামলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ ছিল সাত বছর বয়সী বাসিত খান মুসাকে লক্ষ্য করে নয়, কিন্তু পুলিশের ছোড়া গুলিতে তার মাথা ভেদ হয়ে একই গুলি দাদি মায়া ইসলামের শরীরে বিদ্ধ হওয়ার ঘটনা।

বাসিতের বাবা মো. মোস্তাফিজুর রহমান ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়ে বলেন, "আমার ছেলে বেঁচে আছে, কিন্তু কথা বলার শক্তি হারিয়েছে। আমার মা মারা গেছেন। আমাদের পরিবারের সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে।"

তদন্ত ও ডিজিটাল প্রমাণ
এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন ২০২৫ সালের বৃহস্পতিবার (৩১ জুলাই) চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে জমা দেয় ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা।

পরে বৃহস্পতিবার (৭ আগস্ট) প্রসিকিউশন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে। বৃহস্পতিবার (১৮ সেপ্টেম্বর) অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়।

সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয় বৃহস্পতিবার (২৩ অক্টোবর)। শেষ হয় মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি)। এরপর সোমবার (৩ ফেব্রুয়ারি) যুক্তিতর্ক শেষ হয়। প্রথমে মঙ্গলবার (৪ মার্চ) রায় ঘোষণার দিন ধার্য হলেও প্রসিকিউশনের আবেদনে তা পিছিয়ে যায়। পরে সোমবার (১৫ জুন) রায়ের জন্য রোববার (২৮ জুন) দিন নির্ধারণ করা হয়।

মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা ও আইসিটি তদন্ত সংস্থার সহকারী পরিচালক সৈয়দ আব্দুর রউফ সিসিটিভি ফুটেজ, কল রেকর্ড, ওয়্যারলেস বার্তা এবং ভিডিওসহ একাধিক ডিজিটাল আলামত আদালতে উপস্থাপন করেন।

প্রসিকিউশন দাবি করে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুলির ভিডিও এবং পরে প্রকাশ পাওয়া এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারের স্বীকারোক্তিমূলক ভিডিও এআই দিয়ে তৈরি নয়, বরং তা সত্য ও নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল প্রমাণ।

চঞ্চলের স্বীকারোক্তি নিয়ে বিতর্ক
মামলার বিচার চলাকালে চঞ্চল চন্দ্র সরকারের একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে নতুন মোড় নেয় বিচার।

প্রসিকিউশন আদালতে জানায়, ভিডিওটিতে চঞ্চল স্বীকার করেছেন কীভাবে এবং কার নির্দেশে গুলি চালানো হয়েছিল। এই ভিডিও আগে অনিচ্ছাকৃতভাবে বাদ পড়ে গিয়েছিল। পরে তা অতিরিক্ত প্রমাণ হিসেবে যুক্ত করার আবেদন মঞ্জুর করেন ট্রাইব্যুনাল।

তবে দ্বিতীয় দফার জবানবন্দিতে চঞ্চল দাবি করেন, তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে ওই ভিডিও ধারণ করা হয়েছিল। তিনি অভিযোগ করেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এক প্রসিকিউটর তাকে চাপ দিয়ে স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করেছিলেন। সংশ্লিষ্ট প্রসিকিউটর পরে এ অভিযোগ অস্বীকার করেন।

সাক্ষীদের মধ্যে ছিলেন পুলিশ সদস্যও
মামলায় প্রসিকিউশন ১৪ জন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী উপস্থাপন করে। তাদের মধ্যে ছিলেন আহত আমির হোসেন, নিহত নাদিমের স্ত্রী, নিহত মায়া ইসলামের ছেলে, গুলিবিদ্ধ বাসিতের বাবা, প্রত্যক্ষদর্শী, তদন্ত কর্মকর্তা, চিকিৎসাকর্মী এবং রামপুরা থানায় দায়িত্ব পালন করা কয়েকজন পুলিশ সদস্য।

সাক্ষ্য দেন রামপুরা থানার এসআই গোলাম কিবরিয়া খানও। তিনি আদালতে বলেন, ভাইরাল ভিডিওতে কার্নিশে ঝুলে থাকা তরুণকে গুলি করা পুলিশ সদস্যদের রামপুরা থানার এক সভায় শনাক্ত করা হয়েছিল।

তিনি আরও দাবি করেন, ২০২৪ সালের বৃহস্পতিবার (১৮ জুলাই) আন্দোলন দমনে চাইনিজ রাইফেল ব্যবহার করে হাঁটু গেড়ে গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এবং ঘটনার কয়েক দিন পর থানায় এসে তৎকালীন ওসিকে নগদ এক লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়া হয়।

তবে এই সাক্ষীর ভূমিকা নিয়েও ট্রাইব্যুনাল প্রশ্ন তোলে। কারণ, ঘটনার দিন তার নামেও সরকারি অস্ত্র ও গুলি বরাদ্দ ছিল। এ বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম আদালতকে জানান, প্রয়োজন হলে বিষয়টি আলাদাভাবে তদন্ত করা হবে।

মামলার অগ্রগতি
মামলাটি ছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট অন্যতম আলোচিত মামলা। তদন্ত পর্যায়ে ৩০ জনের জবানবন্দি নেওয়া হলেও আদালতে গুরুত্বপূর্ণ ১৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য উপস্থাপন করা হয়।

রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষ একাধিক দফায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে। নতুন ডিজিটাল প্রমাণ যুক্ত হওয়ায় রায় ঘোষণাও একবার পিছিয়ে যায়। সবশেষে অতিরিক্ত প্রমাণ, সাক্ষ্য এবং আইনি যুক্তি পর্যালোচনা শেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এই রায় দেন।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে