বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত দীর্ঘদিন ধরে নানা সংকটে জর্জরিত। খেলাপি ঋণের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, দুর্বল করপোরেট সুশাসন, রাজনৈতিক প্রভাব এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের অদক্ষতা- সব মিলিয়ে খাতটির প্রতি জনগণের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাংক ৪৫ কোটি ডলারের অর্থায়ন অনুমোদন করেছে, যা ব্যাংকিং খাতকে আরও স্থিতিশীল, জবাবদিহিমূলক ও শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে। প্রকল্পের আওতায় ক্ষুদ্র আমানতকারীদের সুরক্ষা, আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ, ব্যাংক পুনর্গঠন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে প্রশ্ন হলো, এই অর্থায়ন কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হবে। অতীতে দেখা গেছে, সংস্কারের নানা পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক চাপ, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং স্বজনপ্রীতি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। খেলাপি ঋণের হার দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি হওয়া প্রমাণ করে, সমস্যাটি কাঠামোগত। শুধু অর্থায়ন নয়, বরং কঠোর নীতি, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে ব্যাংকিং খাতের সংকট কাটানো সম্ভব নয়। আমাদের মতে, ব্যাংকিং খাত সংস্কারে তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রথমত, ক্ষুদ্র আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আমানত বীমা ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে পেশাদার ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। তৃতীয়ত, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়িয়ে সাইবার নিরাপত্তা ও ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে জনগণের আমানত নিরাপদ থাকে। আমাদের প্রত্যাশা, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন শুধু কাগুজে সংস্কারে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বাস্তবায়নের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনবে। একটি শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক ব্যাংকিং ব্যবস্থা ছাড়া অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।