রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতালটির লাইসেন্স স্থগিতের সিদ্ধান্তকে যৌক্তিক বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তাঁর ভাষ্য, অক্সিজেনের অভাব ও চরম অবহেলার কারণেই ওই নবজাতকদের মৃত্যু হয়েছে। তাই দেশের হাসপাতালগুলোকে শৃঙ্খলার আওতায় আনতেই সরকার এ পদক্ষেপ নিয়েছে।
রোববার (২৮ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ কথা বলেন। আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স স্থগিত নিয়ে বিরোধী দলের সমালোচনার জবাব দিতে গিয়ে তিনি বলেন, হাসপাতালটি বন্ধ করে দেওয়া হয়নি, কেবল লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, “অনেক সংসদ সদস্য বলেছেন, ২০০ থেকে ২৫০ টাকায় সেখানে ডায়ালাইসিস হয়, এটা সত্য। কিন্তু মাথাব্যথায় কি মাথা কেটে ফেলা যায়? না, কাটা যায় না। তবে যারা মাথা কাটে, তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।”
গত ২৭ মে কোরবানির ঈদের আগের দিন সকালে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডে একে একে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়। পরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলার প্রমাণ পাওয়ার কথা জানানো হয়। প্রতিবেদনে অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতি, দীর্ঘ সময় সেন্ট্রাল এসি বন্ধ থাকা, বিকল্প ভেন্টিলেশনের অভাব এবং কক্ষে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বেড়ে যাওয়াকে মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এরপর ১১ জুন হাসপাতালটির লাইসেন্স স্থগিতের ঘোষণা দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
সংসদে বক্তব্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ইউনাইটেড হাসপাতাল ও বার্ন ইউনিটে আগুনের ঘটনার সঙ্গে আদ্-দ্বীনের ঘটনার তুলনা টেনে আনা সমালোচনারও জবাব দেন। তিনি বলেন, “ইউনাইটেড এবং বার্ন ইউনিটের ঘটনা ছিল বিদ্যুতের কারণে দুর্ঘটনা। কিন্তু আদ্-দ্বীনের ঘটনা অবহেলার। আপনারা কেউ সেখানে যাননি, অথচ সংসদে এসে কথা বলছেন।”
নবজাতকদের মৃত্যুর বর্ণনা দিতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে মন্ত্রী বলেন, “ছয়টা শিশু যখন বাঁচার জন্য ছটফট করছিল, তখন সেখানে এসি বন্ধ, জানালা বন্ধ, কোনো অক্সিজেন ছিল না। ১৬ থেকে ১৭ জন মা কাঁদছিলেন, ছোটাছুটি করছিলেন, কিন্তু একজন ডাক্তারও আসেননি। কার্বন ডাই-অক্সাইডের কারণে শিশুগুলো মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ঘটনার পর হাসপাতালের মালিক ঘটনাস্থলে পর্যন্ত যাননি। তবে তিনি নিজে পরদিন হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেছেন। “দুইজন চিকিৎসক একমত হয়েছেন, অবহেলা ও অক্সিজেনের অভাবেই বাচ্চাগুলোর মৃত্যু হয়েছে,” বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনার কথাও সংসদে তুলে ধরেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, হাসপাতালের অনুমোদিত ভবনের ভেতরেই একটি বেকারি কারখানা পরিচালিত হচ্ছিল। সেখানে প্লাস্টিক বর্জ্যের স্তূপও ছিল, যা অগ্নিকাণ্ডের বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, “যেখানে হাসপাতালের অনুমতি নেওয়া হয়েছে, সেই ভবনের ভেতর বেকারি কারখানা করা হয়েছে। গন্ধে ঢোকা যায় না। এমন প্লাস্টিক বর্জ্য রাখা হয়েছে যে আগুন লাগলে কোনো রোগী বা স্বজন বাঁচতে পারবেন না।”
সরকার মানুষের জীবন রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বদ্ধপরিকর উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমরা সব হাসপাতালকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে চাই। সবার আগে বাংলাদেশ, সবার আগে দেশের ১৮ কোটি মানুষ।”
বিরোধী দলের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, “আমরা শুধু লাইসেন্স স্থগিত করেছি। প্রতিটি বিষয়কে কেন নিজেদের দলীয় আদর্শের সঙ্গে একীভূত করেন? মানুষের জীবন নিয়ে রাজনীতি করা উচিত নয়।”
বাজেট প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, এবারের বাজেটে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমানোর বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ক্যানসার চিকিৎসা, কিডনি ডায়ালাইসিস এবং ওষুধ উৎপাদনের কাঁচামালের ওপর শুল্ক কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে মানুষের পকেটের খরচ কমে।