দেশে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে গুরুতর অপরাধ

এফএনএস স্পোর্টস | প্রকাশ: ৩০ জুন, ২০২৬, ০৮:১০ এএম
দেশে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে গুরুতর অপরাধ

দেশে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে গুরুতর অপরাধ। দেশজুড়েই দিন দিন অপরাধীরা  বেপরোয়া উঠেছে। আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক বিরোধ, মাদক ব্যবসা ও জমিজমা-সংক্রান্ত দ্বন্দ্বসহ নানা কারণে প্রতিনিয়ত ঘটছে প্রাণহানির ঘটনা। এমনকি পুলিশের ওপরও হামলার ঘটনা ঘটছে। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত এখন মাদকের বিস্তার। শহরগুলোতে সাধারণ মানুষের আতঙ্কের জন্ম দিচ্ছে কিশোর গ্যাং কালচার। মূলত সামপ্রতিক সময়ে সামাজিক অস্থিরতা, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধীরগতির কারণে পরিস্থিতি আরো নাজুক হচ্ছে। আর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পেছনে অবৈধ অস্ত্রের সহজলভ্যতা একটি বড় কারণ। বিগত জুলাই আন্দোলনের সময় বিপুল অস্ত্র ও গুলি লুট হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। আর এখনো উদ্ধার হয়নি একটি বড় অংশই। ওসব অস্ত্র অপরাধে ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশে গুরুতর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি। বতৃমানে খুনসহ গুরুতর অপরাধের ঊর্ধ্বগতি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ ছাড়া বিকল্প নেই। যদিও জুলাই আন্দোলনের সময় লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান চলছে। কিন্তু তাতে আশানুরূপ সফলতা মেলেনি। এখন আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাকাভিত্তিক সন্ত্রাসীদের ধরতে থানা-পুলিশকে আরো বেশি তৎপর হতে হবে। কারণ আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ ও হামলা, দলীয় ও অন্তঃকোন্দল ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করেই অধিকাংশ হামলার ঘটনা ঘটছে।

সূত্র জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল চার মাসে এক হাজার ১৪২টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে পাঁচ ধরনের গুরুতর অপরাধে ১৩ হাজার ২২১টি মামলা হয়েছে। অর্থাৎ দেশের বিভিন্ন থানায় প্রতিদিন গড়ে ১১০টি অপরাধের মামলা দায়ের হচ্ছে। বর্তমানে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যেই অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করে খুনের মতো ঘটনা ঘটছে। গত ৮ জুন রাতে মৌচাক এলাকায় বিএনপির এক নেতাকে হত্যা করা হয়। গত ২৮ এপ্রিল রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় মুখোশধারী সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে গুলি তালিকাভুক্ত এক শীর্ষ সন্ত্রাসীকে হত্যা করা। আর অতিসম্প্রতি রাজধানীর রামপুর এলাকায় নিজ বাসার সামনে সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন ঢাকার আরেক সন্ত্রাসী। গত ৯ মে গাজীপুরের কাপাসিয়ার রাউৎকোনা গ্রামে তিন শিশুসহ একই পরিবারের পাঁচজনকে গলাকেটে হত্যা করা হয়েছে। খুলনার লবণচরা থানার মাথাভাঙা এলাকার কাজীপাড়া বাজারে এক বিএনপিকে (৩৫) গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। খুলনা মহানগরে বর্তমানে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদক কারবার দমনে বিশেষ যৌথ অভিযান চলমান। তার মধ্যেই প্রকাশ্যে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নগরবাসীর মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। পুলিশের তথ্যানুযায়ী চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে খুলনা নগরে ১৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। তাছাড়া সমপ্রতি রাজধানীর মতিঝিল শাপলা চত্বরসংলগ্ন জনতা ব্যাংকের সামনে সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে মানি এক্সচেঞ্জের ব্যবসায়ীকে গুলি করে ১৪ হাজার ডলার ভর্তি ব্যাগ লুট করে নেয়া হয়। গত ১৩ জুন চট্টগ্রামের রাউজানের একটি বাজারের প্রকাশ্যে গুলি করে যুবদল নেতাকে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। গত শনিবার চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ঘরে ঢুকে মা ও মেয়েকে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় একের পর এক আলোচিত হত্যাকাণ্ড সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়িয়েছে। 

সূত্র আরো জানায়, দেশে বিপুল অবৈধ অস্ত্রের সহজলভ্যতা এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে ধীরগতির কারণে আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটছে। স্বস্তি ফিরছে না জনমনে। দিন যতোই গড়াচ্ছে অপরাধীরা ততোই বেপরোয়া হয়ে উঠছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের মব সন্ত্রাস এখন ভিন্ন আঙ্গিকে দেখা দিয়েছে। অথচ সামনেই স্থানীয় সরকার ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন। সেক্ষেত্রে এখনই অপরাধীদের লাগাম টেনে না ধরলে ওসব নির্বাচনের সময় অবৈধ অস্ত্রধারীরা আরো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে। কারণ নির্বাচনে প্রভাবশালী প্রার্থীরাও নিজেদের বিজয় নিশ্চিত করতে অপরাধীদের ব্যবহার কতে পারে।

এদিকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তৎপরতাও অপরাধ বাড়ার মূলে রয়েছে। শীর্ষ সন্ত্রাসীরা পর্দার আড়ালে থেকে সহযোগীদের পরিচালনা করছে। তাদের হাতে কয়েক হাজার অবৈধ অস্ত্র রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী জামিন পাওয়া ওই শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অনেকেই দেশের বাইরে পালিয়ে যায়। আবার তাদের কেউ কেউ এরই মধ্যে দেশে ফিরেছে। আবার অনেকেই চেষ্টা চালাচ্ছে দেশে ফেরার। তাদের বাইরে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে গ্রেফতার না হওয়ারা রাজধানীর মতিঝিল ও রামপুরাসহ আরো কয়েকটি এলাকায় ব্যাপকভাবে চাঁদাবাজি শুরু করেছে। তালিকাভুক্ত ওসব সন্ত্রাসী এখন দেশ ও দেশের বাইরে থেকে অপরাধ জগৎ আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করছে। 

অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে টাঙ্গাইলের মাওলানা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. উমর ফারুক জানান, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরো অবনতি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে আধুনিকায়ন এবং অপরাধ দমনে কার্যকর কৌশল দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তা যা যথাযথভাবে হয়নি।

সার্বিক বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দেশে অবৈধ অস্ত্রের ছড়াছড়ি। ওসব অস্ত্রে খুনাখুনির কারণে সমাজে আতঙ্ক ছড়াছে। পরিস্থিতি আরো খারাপ হওয়ার আগেই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে আরো তৎপর হতে হবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে