দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত কিছু চিকিৎসককে নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা-সমালোচনা থাকলেও, অনেকেই রয়েছেন সমস্ত বিতর্কের ঊর্ধ্বে। পেশাগত দায়িত্বের বাইরে গিয়ে তারা হয়ে উঠেছেন প্রকৃত অর্থেই ‘মানবতার ফেরিওয়ালা’। অর্থ সংকটে যেসকল দরিদ্র ও দুস্থ রোগী সঠিক চিকিৎসা পান না, তাদের জন্য এমনই এক ভরসার নাম ডা. অশোক কুমার মোদক।
তিনি শুধু গরিব মানুষের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবাই দিচ্ছেন না, বরং নিজ এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়াতে প্রতি সপ্তাহে রাজধানী ঢাকা থেকে ছুটে আসেন তার প্রিয় জন্মভূমি রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দিতে। পরিচয় ও শিক্ষা জীবন: ডা. অশোক কুমার মোদক রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার বহরপুরের চন্দনপুর গ্রামের মৃত শশাংক চন্দ্র মোদক ও গৌরি রানী মোদকের সন্তান। মেধাবী এই চিকিৎসক ২০০১ সালে বহরপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০০৩ সালে রাজবাড়ী সরকারী কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এরপর তিনি ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে তিনি পঙ্গু হাসপাতাল থেকে ডি-অর্থো এবং যুক্তরাজ্য (টক) থেকে অর্থোপেডিক সার্জারিতে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন।
বর্তমানে তিনি ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে অর্থো-সার্জারি বিভাগের সহকারি অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। টাকা ছাড়াই মিলছে বিশেষজ্ঞ সেবা: ঢাকায় ব্যস্ত সময় কাটানোর পরও নাড়ির টানে প্রতি শুক্রবার বালিয়াকান্দিতে ছুটে আসেন ডা. অশোক। বালিয়াকান্দির 'হাসনা স্পেশালাইজড মেডিকেল সেন্টার' এবং 'বহরপুর ডিজিটাল মেডিকেল সেন্টারে' নামে মাত্র ফিতে তিনি নিয়মিত রোগী দেখেন। আর অসহায় ও দরিদ্র রোগীদের ক্ষেত্রে কোনো ফি-ই নেন না তিনি। বালিয়াকান্দি সদর ইউনিয়নের পাইককান্দি গ্রামের ৬২ বছর বয়সী বিধবা নারী আঞ্জুমানারা বেগম জানান তার অভিজ্ঞতা। দীর্ঘ দিন ধরে মাজার (কোমর) সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। ফরিদপুর গিয়ে কয়েক দফায় চিকিৎসা করাতে গিয়ে খরচ হয়ে যায় প্রায় ২০ হাজার টাকা, কিন্তু সুস্থ হননি। একপর্যায়ে অর্থের অভাবে চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যায় তার। আঞ্জুমানারা বেগম বলেন: হাসনা মেডিকেল সেন্টারের মালিক অনিক সিকদারের পরামর্শে তিনি ডা. অশোক কুমার মোদক স্যারের কাছে যান এবং তার আর্থিক সমস্যার কথা জানান। এরপর থেকে স্যার তাকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসা দিচ্ছেন। যতবার গিয়েছেন, একবারও তিনি তার কাছ থেকে কোনো টাকা নেননি। হাসনা স্পেশালাইজড মেডিকেল সেন্টারের মালিক অনিক সিকদার বলেন, ডা. অশোক স্যার আমাদের ক্লিনিকে প্রতি শুক্রবার রোগী দেখেন। তিনি আগে থেকেই আমাদের কড়া নির্দেশনা দিয়ে রেখেছেন কোনো গরিব রোগী যেন টাকার অভাবে চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে না যায়। স্যারের নির্দেশনা অনুযায়ী কোনো অসহায় রোগী এলেই আমরা সরাসরি স্যারের রুমে পাঠিয়ে দিই। জানতে চাইলে ডা. অশোক কুমার মোদক বলেন, মূলত সামাজিক ও মানবিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই আমি এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ছুটে আসি। প্রতি সপ্তাহে ঢাকা থেকে আসার জার্নিতে কিছুটা কষ্ট ও ঝুঁকি থাকলেও, দিনশেষে মানুষের মুখে হাসি ফোটানো এবং তাদের জন্য কিছু করতে পারার মাঝে যে তৃপ্তি, তা অন্য কোথাও নেই।
তিনি আরও জানান, নিজ এলাকার মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় তার এই মানবিক সেবা আগামীতেও অব্যাহত থাকবে। বর্তমান তিনি প্রতি শুক্রবার সকাল ৭ টা থেকে বেলা ২ টা পর্যন্ত বহরপুর ডিজিটাল মেডিকেল সেন্টার এবং বেলা ৪ টা থেকে রাত ৮ টা পর্যন্ত হাসনা স্পেশালাইজড মেডিকেল সেন্টার এ নিয়মিত রোগী দেখেন।