প্রচারহীনতায় ধুঁকছে সাশ্রয়ী ‘রাষ্ট্রীয় ডাকসেবা’

মো. শামীউল আলীম শাওন | প্রকাশ: ৩ জুলাই, ২০২৬, ০৩:৩৯ পিএম
প্রচারহীনতায় ধুঁকছে সাশ্রয়ী ‘রাষ্ট্রীয় ডাকসেবা’

‘রাত্রির পথে পথে চলে কোনো নিষেধ জানে না মানার। দিগন্ত থেকে দিগন্তে ছোটে রানার-কাজ নিয়েছে সে নতুন খবর আনার।’ সুকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের ‘রানার’ কবিতার এই একটি লাইন থেকেই বোঝা যায়, চিঠির সঙ্গে মানুষের আবেগের সম্পর্ক কত গভীর।

গভীর রাতে রানারের লণ্ঠন আর পিঠের ওপর চিঠির বস্তার সেই চেনা ছবিটা এখন আর নেই। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আমাদের জীবন বদলে গেছে। রানারের সেই আকুল করা চিঠি হয়তো এখন ফেসবুকের মেসেজ কিংবা হোয়াটসঅ্যাপের টেক্সটে রূপ নিয়েছে। কিন্তু তাই বলে কি ডাক বিভাগের গুরুত্ব কমে গেছে? একদমই না। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে, বিশেষ করে কম খরচে পণ্য পরিবহনে ডাক বিভাগ এখনো সাধারণ মানুষের জন্য কত বড় ভরসা, তা আমরা অনেকেই জানি না। আর এই না জানার একমাত্র কারণ হলো-সঠিক প্রচারের অভাব।

গত ৪ জুনের একটি বাস্তব ঘটনা দিয়েই শুরু করা যাক। মোহাম্মদপুর পোস্ট অফিসে গিয়ে দেখা গেল, সাতক্ষীরা থেকে দুই ঝুড়িতে আসা ৪০ কেজি আম মাত্র ৪০০ টাকায় ‘স্পিড পোস্ট’ সেবার মাধ্যমে চলে এসেছে। অথচ যেকোনো বেসরকারি কুরিয়ার সার্ভিস এই পরিমাণ আম পরিবহনের জন্য তিন থেকে চারগুণ বেশি টাকা হাতিয়ে নিত। একইভাবে, খুলনা থেকে ৬০ কেজি মাংস পরিবহনে যেখানে বেসরকারি কুরিয়ারে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা খরচ হয়, সেখানে ডাক বিভাগের স্পিড পোস্টে খরচ মাত্র ৩১৫ টাকা! দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ পত্রিকায় প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই চোখ কপালে ওঠার মতো তথ্য উঠে এসেছে।

ভাবুন তো, যেখানে বেসরকারি কুরিয়ারের চেয়ে ৫-৬ গুণ কম খরচে সরকারি ডাক বিভাগ পণ্য পৌঁছে দিচ্ছে, সেখানে সাধারণ মানুষ কেন এখনো বেশি টাকা দিয়ে বেসরকারি কুরিয়ারে লাইন দিচ্ছে? উত্তরটা খুব সহজ-ডাক বিভাগের এই চমৎকার ও সাশ্রয়ী সেবাগুলোর কোনো প্রচার নেই। কোনো বিজ্ঞাপন নেই, নেই আধুনিক বিপণন ব্যবস্থা। ফলে, দেশের সাড়ে আট হাজারেরও বেশি স্থায়ী ডাকঘর এবং প্রায় ৪০ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর এক বিশাল অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটি বছরের পর বছর লোকসান গুনছে। ডাক অধিদপ্তরের একজন পরিচালকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুধু আন্তর্জাতিক পার্সেল পাঠানোর ক্ষেত্রেই সিস্টেমের ঘাটতি ও প্রচারহীনতার কারণে ডাক বিভাগ প্রতি বছর প্রায় ৪০০ কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।

অবশ্য আশার কথা হলো, সরকার এই অচলাবস্থা ভাঙতে বড় কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। যুগের চাহিদা মাথায় রেখে চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি উপদেষ্টা পরিষদ ১২৭ বছরের পুরোনো ব্রিটিশ আমলের দ্য পোস্ট অফিস অ্যাক্ট, ১৮৯৮ পরিবর্তন করে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে সম্পূর্ণ আধুনিক ডাকসেবা অধ্যাদেশ, ২০২৬। এক প্রতিবেদনে জানা যায়, এই নতুন আইনের ফলে এখন আর পুরোনো কাগজের টিকিটের ওপর নির্ভর করতে হবে না; চালু হচ্ছে ডিজিটাল ‘ই-স্ট্যাম্পিং’। গ্রাহকেরা অনলাইনে বিল দিয়ে বারকোড বা কিউআর কোড পাবেন। শুধু তাই নয়, পণ্য আদান-প্রদান আরও নিরাপদ করতে প্রেরক ও প্রাপকের এনআইডি বা পাসপোর্ট যাচাইয়ের মাধ্যমে ‘কেওয়াইসি’ পদ্ধতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এমনকি নদীভাঙন বা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যারা ঠিকানা হারিয়েছেন, তাদের জন্য জিও-ফেন্সিং ও ডিজিটাল ঠিকানা সংরক্ষণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব বিলকিস জাহান রিমি জানিয়েছেন, সম্প্রতি অর্থ বিভাগের সম্মতিতে ডাক মাশুলের নতুন হার অনুমোদন করা হয়েছে, যা কার্যকর হলে সরকারের রাজস্ব অনেক বাড়বে। পাশাপাশি ডাক বিভাগকে আরও জনবান্ধব করতে রাজধানীতে গ্রাহকের দোরগোড়ায় এজেন্ট নিয়োগের পরিকল্পনাও করা হচ্ছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত সব দারুণ আধুনিকায়ন আর আইনি সংস্কার সাধারণ মানুষের কী কাজে আসবে, যদি তারা বিষয়গুলো জানতেই না পারে? সরকারি আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় যেখানে বেসরকারি কুরিয়ারের মতো চটজলদি বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না, সেখানে টিকে থাকার একমাত্র হাতিয়ার হলো ‘প্রচার’।

ডাক বিভাগকে যদি সত্যি সত্যিই সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে হয়, তবে আধুনিকায়নের পাশাপাশি এর সাশ্রয়ী সেবাগুলোর ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানো এখন সময়ের দাবি। টেলিভিশন, সংবাদপত্র এবং আজকের যুগের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে জোরদার প্রচার চালাতে হবে। সাধারণ মানুষকে জানাতে হবে যে, তাদের ঘরের পাশেই সবচেয়ে কম খরচে পণ্য পাঠানোর নিরাপদ ব্যবস্থা রয়েছে। তবেই বিপুল পরিমাণ সরকারি ভর্তুকির অবসান ঘটবে এবং আমাদের ঐতিহ্যের ডাক বিভাগ আবার নতুন প্রাণ পেয়ে সাধারণ মানুষের সেবায় বুক ফুলিয়ে দাঁড়াতে পারবে।

লেখক : লেখক, উন্নয়ন ও অধিকারকর্মী

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে