চট্টগ্রাম বন্দরের সীমা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ওই বন্দরটির সীমা ১৯৭১ সালে মাত্র ৫ দশমিক ৫ নটিক্যাল মাইল ছিল। তখন পতেঙ্গা লাইট হাউজ থেকে অর্ধবৃত্ত আকারে সাগরের দিকে ওই সীমা বিবেচনা করা হতো। বিগত ২০০৭ সালে তা বর্ধিত করা হয় ৭ নটিক্যাল মাইলে। আর ২০১৯ সালে মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করতে গিয়ে বন্দরের সীমা বাড়িয়ে করা হয় ৬২ নটিক্যাল মাইল। তখন বন্দরের সীমা বর্ধিত করা হয় উত্তরে ফৌজদারহাট পর্যন্ত এবং দক্ষিণে মহেশখালী পর্যন্ত। ওই সীমা এখন উত্তর দিকে আরো ১০ নটিক্যাল মাইল বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে মিরসরাই ইকোনমিক জোন হয়ে ফেনী নদীর মোহনা পর্যন্ত। তাতে চট্টগ্রাম বন্দরের আওতায় আসছে ফেনী নদীর মোহনা পর্যন্ত। ফলে আগামীতে মিরসরাই ইকোনমিক জোনে জাহাজ ভেড়ানোর জন্য নির্মাণ করা যাবে জেটিও। একই সঙ্গে নতুন অ্যাংকরেজও পাচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর। তাতে নিরাপদ আশ্রয় পাবে সীতাকুণ্ড সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় আন্তর্জাতিক রুটে চলাচলকারী জাহাজগুলো। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, চট্টগ্রাম বন্দরের সীমা বাড়ালে নিরাপত্তা ও ড্রেজিং সুবিধা পাবে ওই সীমার মধ্যে অবস্থানকালে জাহাজগুলো। বিনিময়ে বন্দর পাবে পোর্ট ডিউস। তাতে বন্দরের রাজস্ব বাড়বে। পাশাপাশি ওই এলাকায় বন্দর কর্তৃপক্ষজেটিও নির্মাণ করতে পারবে। বন্দরের সীমা মিরসরাই ইকোনমিক জোন পর্যন্ত বাড়লে এবং আগামীতে লাইটার জেটি নির্মাণের সুযোগ দিলে পণ্য আনা-নেওয়া আরো সহজ হবে। তাতে সুবিধা পাবে মিরসরাই ইকোনমিক জোনে গড়ে ওঠা শিল্প-কারখানাগুলো। তবে জেটি নির্মাণের আগে আইনগতভাবে বন্দরের সীমায় আনতে হবে ওই এলাকাটি। তারপরই প্রয়োজনসাপেক্ষে বন্দর কর্তৃপক্ষ জেটি নির্মাণ বা অন্য কোনো কাজে ওই এলাকা ব্যবহার করতে পারবে। বন্দরের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ওই সীমা বর্ধিত করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, বছরে চট্টগ্রাম বন্দরে চলাচল করে প্রায় ৪ হাজার জাহাজ। কনটেইনার ও বাল্ক পণ্যবাহী ওসব জাহাজ বন্দরের জেটিতে প্রবেশের আগে বহির্নোঙ্গরের আলফা, বিটা ও চার্লি অ্যাংকরেজ (জাহাজ রাখার স্থান) ও কুতুবদিয়া অ্যাংকরেজে অবস্থান করতে হয়। আলফা অ্যাংকরেজ উত্তর দিকে অবস্থিত এবং এখানে ১০ মিটার ড্রাফটের জাহাজগুলো অবস্থান করে। অ্যাংকরেজ চার্লি হলো সবচেয়ে দক্ষিণে। সেখানে লাইটার জাহাজ ও শিডিউল ছাড়া জাহাজগুলো অবস্থান করে। আর আলফা ও চার্লির মধ্যখানে হলো বিটা অ্যাংকরেজ। যে জাহাজগুলো বন্দরের জেটিতে ভেড়ার অনুমতি পায় সেগুলো সেখানে অবস্থান করে। আর সবচেয়ে বড় মাদারভেসেলগুলো কুতুবদিয়া অ্যাংকরেজে অবস্থান করে। যদিও কনটেইনারবাহী জাহাজগুলো বহির্নোঙ্গর থেকে জেটিতে ভিড়লেও বাল্কপণ্যবাহী অনেক মাদারভেসেল (বড় জাহাজ) বহির্নোঙ্গর থেকে লাইটার জাহাজে (ছোট জাহাজ) পণ্য স্থানান্তর করে। আর লাইটার জাহাজ দেশের বিভিন্ন স্থানে ওসব পণ্য পরিবহন করে। বর্তমানে প্রায় ৪ হাজার লাইটার জাহাজ পণ্য পরিবহনে জড়িত। এখন বন্দরের সীমা বাড়লে সীতাকুন্ড এলাকায় নতুন আরেকটি অ্যাংকরেজ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। ওই জায়গায় পানির গভীরতা বেশি হওয়ায় অনেক মাদার ভেসেল গভীরতা ও প্রয়োজন অনুযায়ী সীতাকুন্ড উপকূলে অ্যাংকরেজ করতে পারবে। আর সন্দ্বীপ চ্যানেলের কারণে প্রাকৃতিকভাবে নিরাপদ অবস্থায় রয়েছে ওই এলাকাটি। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের ৯৩ শতাংশ পণ্য পরিবাহিত হয়। বছরে গড়ে ১৩ কোটি মেট্রিক টন পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের পাশাপাশি ওই বন্দর দিয়ে ৩২ লাখ কনটেইনার হ্যান্ডলিং হচ্ছে। এবছর কনটেইনার হ্যান্ডলিং ৩৫ লাখে উন্নীত হতে যাচ্ছে।
এদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের সীমা বৃদ্ধি প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবার ও মেরিন) কমোডর আহমেদ আমিন আবদুল্লাহ জানান, চট্টগ্রাম বন্দরের সীমা আরো ১০ নটিক্যাল মাইল বাড়ানোর জন্য নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাবটি অনুমোদন হলে চট্টগ্রাম বন্দরের সীমা উত্তর দিকে বাড়বে। ফলে ফেনী নদীর মোহনা পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরের আওতায় চলে আসবে। চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে আগানো হচ্ছে। ২০৩০ সালে যদি বে টার্মিনাল অপারেশনে আসে, তখন চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙ্গরে অবস্থানকালীন মাদারভেসেলগুলোর জায়গার স্বল্পতা হতে পারে। এখন ওই সীমা বাড়ানোর মাধ্যমে উত্তর দিকে সীতাকুন্ড পর্যন্ত গভীরতা অনুযায়ী জাহাজ অ্যাংকরেজ করা যাবে। একইসঙ্গে লাইটার জাহাজগুলোও অবস্থান করতে পারবে। আর সন্দ্বীপ চ্যানেল হওয়ায় প্রাকৃতিকভাবে ওই জায়গাটি সুরক্ষিত বলে নিরাপদ থাকবে জাহাজগুলোও।