"প্রধানমন্ত্রীরে পাইলে পাও দুইডা ধইরা কইতাম নদীভাঙন থেকে মোগো বাঁচান"

এফএনএস (বরিশাল প্রতিবেদক) :
| আপডেট: ১৩ জুলাই, ২০২৬, ১১:৩১ এএম | প্রকাশ: ১৩ জুলাই, ২০২৬, ১১:৩০ এএম
"প্রধানমন্ত্রীরে পাইলে পাও দুইডা ধইরা কইতাম নদীভাঙন থেকে মোগো বাঁচান"

"প্রধানমন্ত্রীরে পাইলে পাও দুইডা  ধইরা কইতাম-নদীভাঙন থেকে মোগো বাঁচান। বাপ-দাদার জমি সব খুয়াইছি, কবরস্থান খুইয়াছি। এখন বসত ভিডাও নদী খাইয়া ফালাইবে। মোরা কোথায় যামু, কার কাছে দুঃখের কথা কইমু?" আবেগাপ্লুত হয়ে কথাগুলো বলছিলেন-বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার লোহালিয়া গ্রামের ষাটোর্ধ্ব আজাহার মোল্লা। আড়িয়াল খাঁ নদীর ভাঙনকবলিত তীরে বসে নিজের জীবনের দীর্ঘ বেদনার গল্প তুলে ধরেন তিনি। আজাহার মোল্লা বলেন, বাপ-দাদার রেখে যাওয়া প্রায় সব আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এমনকি পারিবারিক কবরস্থানও রক্ষা পায়নি। শেষ সম্বল হিসেবে রয়েছে শুধু বসতভিটা। জীবনের শেষ বয়সে সেখানে শান্তিতে থাকার স্বপ্নও এখন নদীভাঙনের হুমকিতে।

শুধু আজাহার মোল্লাই নন; পাশের সিংহেরকাঠী গ্রামের কামাল সরদারও একই দুর্ভোগের শিকার। তিনি জানান, নদীভাঙনের কারণে পাঁচবার তাকে বাড়ি সরিয়ে নিতে হয়েছে। এখন নতুন করে বাড়ি সরানোর মতো কোনো জায়গাও আর অবশিষ্ট নেই।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বাবুগঞ্জ উপজেলার আড়িয়াল খাঁ নদীর তীরবর্তী সিংহেরকাঠী, লোহালিয়া ও রফিয়াদি গ্রামের শত শত পরিবার গত কয়েক বছরে নদীভাঙনে সর্বস্ব হারিয়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। টানা প্রায় পাঁচ বছরের ভাঙনে তিনটি গ্রামের প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে হাজারো মানুষ চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

স্থানীয়রা জানায় , নদীভাঙন রোধে কার্যকর কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে প্রতি বর্ষা মৌসুমেই নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। গত এক সপ্তাহের টানা বর্ষণ ও নিন্মচাঁপের প্রভাবে নদীর পানি নামতে শুরু করায় কয়েকটি স্থানে আবারও নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে নদীতীরবর্তী মানুষের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। দ্রুত টেকসই নদীশাসন ও স্থায়ী ভাঙন প্রতিরোধের দাবি জানিয়েছেন তারা।

স্থানীয় ইউপি সদস্য জামাল হোসেন বলেন, গত প্রায় ১০ বছর ধরে আড়িয়াল খাঁ নদীর ভাঙনে মীরগঞ্জ ফেরিঘাট থেকে ছোট মীরগঞ্জ হয়ে ময়দানেরহাট রাস্তার মাথা পর্যন্ত তিনটি গ্রাম বিলীনের পথে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসনকে বহুবার লিখিত ও মৌখিকভাবে জানিয়েছি। মাঝে মধ্যে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলা হলেও তাতে কোনো স্থায়ী সুফল মেলেনি। তাই আমরা স্থায়ী সমাধান চাই। তিনি আরও জানান, নদীভাঙনে নিঃস্ব হওয়া অন্তত ১৭টি পরিবার সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পে পুনর্বাসিত হলেও এখনও শত শত পরিবার চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। অপরদিকে নদীবেষ্টিত বরিশালের চারপাশ দিয়ে বয়ে গেছে কীর্তনখোলা, পদ্মা, মেঘনা, আড়িয়াল খাঁ, তেঁতুলিয়া, সন্ধ্যা, কালাবদর, জয়ন্তী, কারখানাসহ অসংখ্য নদী। এসব নদীর অব্যাহত ভাঙনে প্রতিবছর বদলে যাচ্ছে জেলার ভৌগোলিক চিত্র। নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি, বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নানা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, বিভাগের প্রায় ১০২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ বর্তমানে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

অপরিকল্পিত বেড়িবাঁধ নির্মাণ, নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন, নদীতীর কেটে ইটভাটায় মাটি নেওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি নদীশাসনের অভাবের কারণেই প্রতি বছর লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা। মেহেন্দিগঞ্জ ও হিজলা উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা পদ্মা, মেঘনা, কালাবদর ও তেঁতুলিয়া নদীর ভাঙনে প্রতিবছর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একইভাবে সন্ধ্যা ও আড়িয়াল খাঁ নদীর ভাঙনে বিপর্যস্ত মুলাদী ও বাবুগঞ্জ উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদ। বাবুগঞ্জ উপজেলার মাধবপাশা ছাড়া কেদারপুর, চাঁদপাশা, দেহেরগতি, রহমতপুর ও জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙন অব্যাহত রয়েছে।

এছাড়াও কীর্তনখোলা নদীর ভাঙনে বরিশাল সদর উপজেলার চরবাড়িয়া ও শায়েস্তাবাদ ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের পরেও চরবাড়িয়ায় বর্ষা মৌসুমে নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে। চরবাড়িয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা কাইউম হোসেন বলেন, নদী আমাদের সব কেড়ে নিয়েছে। তিনবার বাড়ি হারিয়েছি। এখন যেখানে আছি, সেটিও ভাঙনের মুখে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আমাদের বাঁচার আর কোনো উপায় থাকবে না। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের বরিশাল বিভাগীয় আহবায়ক রফিকুল আলম বলেন, অপরিকল্পিত বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং নদী থেকে অনিয়ন্ত্রিত ও অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণেই বরিশালে প্রতিবছর ব্যাপক নদীভাঙন হচ্ছে এবং লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছেন। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, গত আট বছরে নদীভাঙন রোধে অন্তত ১০টি প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তবে অধিকাংশ প্রকল্প এখনও অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী আবু বকর সিদ্দিক ভূঁইয়া বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। জরুরি ভাঙন প্রতিরোধের পাশাপাশি স্থায়ী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণের জন্য কয়েকটি বড় প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলেই দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।

উল্লেখ্য, আজ (১৩ জুলাই) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বরিশাল সফরকে ঘিরে নদীভাঙনকবলিত জনপদের মানুষের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। বিশেষ করে বাবুগঞ্জ, মুলাদী, হিজলা, মেহেন্দিগঞ্জ ও বরিশাল সদরসহ নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাসিন্দারা প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে আড়িয়াল খাঁ, মেঘনা, কীর্তনখোলা ও সন্ধ্যা নদীর তীর রক্ষায় দ্রুত টেকসই বাঁধ নির্মাণ এবং স্থায়ী নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলের দীর্ঘদিনের নদীভাঙন সমস্যার স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার ঘোষণা আসবে বলে প্রত্যাশা করছেন দক্ষিনাঞ্চলের নদী তীরবর্তী সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ।