"আমার মা আমাকে অনেক আদর করত, আমার মায়ের কথা অনেক মনে পড়ে। আমি প্রতিদিন মায়ের কবরের পাশে যাই কিন্তু মাকে তো আর দেখতে পাই না! আমার বাবা আমার মাকে খুন করেছে। আমি আমার মায়ের হত্যাকারী, আমার বাবার বিচার চাই।" কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিহত মাহমুদা আক্তারের নয় বছরের অবুঝ শিশু সন্তান ইকরা আক্তারের এই আকুতি যেন চারপাশের বাতাসকে ভারী করে তুলেছে। পাশে দাঁড়িয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে তার ছোট দুই ভাই-বোন মারিয়া (৪) ও আব্দুল্লাহ (৩)। মায়ের মৃত্যুর দেড় বছর পার হয়ে গেলেও এই তিন নাবালক সন্তানের চোখের পানি শুকায়নি। তারা বোঝে না আদালতের জটিলতা তারা শুধু বোঝে তাদের প্রিয় মা আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। কিন্তু যে বাবা তাদের বুক খালি করেছে সে আজ বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
খবর নিয়ে জানা যায়, ২০১৬ সালে পারিবারিকভাবে গজারিয়া উপজেলার বালুয়াকান্দি ইউনিয়নের বালুয়াকান্দি গ্রামের তারা মিয়ার মেয়ে মাহমুদা আক্তারের (৩৮) সাথে একই ইউনিয়নের আড়ালিয়া গ্রামের কুদ্দুস মিয়ার ছেলে সৌদিপ্রবাসী ইমরানের বিয়ে হয়। নয় বছরের সংসার জীবনে তাদের কোল আলো করে আসে তিন সন্তান। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়েও মাহমুদার কপালে জোটেনি শান্তি। ২০২৫ সালের ১০ জানুয়ারি সকালে আড়ালিয়া গ্রামের নিজ গৃহ থেকে মাহমুদার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। তবে শুরু থেকেই স্বজনদের দাবি এটি নিছক আত্মহত্যা নয় বরং পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।
নিহত মাহমুদার মা মর্জিনা বেগম সেই ভয়াবহ সকালের স্মৃতি চারণ করে বলেন, "সেদিন সকাল সাড়ে নয়টার দিকে ইমরান আমাকে ফোন দেয়। মুঠোফোন লাইনে রেখেই সে আমার মেয়েকে নির্মমভাবে মারধর করতে থাকে। সকাল দশটার দিকে দ্বিতীয় দফায় মারধর করা হয়। আমার ধারণা তখনই ওরা আমার মেয়েকে মেরে ফেলে এবং অপরাধ ঢাকতে লাশ ফ্যানের সাথে ঝুলিয়ে দেয়। ঘটনার পরপরই জামাই ইমরান ও তার বড় ভাই কৌশলে পালিয়ে যায়। বাড়ি কেনার জন্য ৩০ লক্ষ টাকা যৌতুকের দাবিতেই মাহমুদার ওপর এই বর্বর নির্যাতন চালানো হয়েছিল।" এদিকে ঘটনার দিন তড়িঘড়ি করে তিন অবুঝ সন্তানকে নানার বাড়ির উদ্দেশ্যে অটো রিকশায় উঠিয়ে দিয়ে লাশ গুম ও ঘটনা ভিন্নখাতে নেওয়ার চেষ্টাও করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তৎকালীন সময়ে গজারিয়া থানার পুলিশ নিহতের শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়ার কথা স্বীকার করেছিল। হত্যাকাণ্ডের পর দীর্ঘ সময় পলাতক থাকার পর সম্প্রতি প্রধান অভিযুক্ত স্বামী ইমরান হোসেন পুলিশের হাতে আটক হলেও অত্যন্ত দ্রুততার সাথে সে জামিনে মুক্ত হয়ে আসে। আর জামিনে আসার পর থেকেই নিহতের পরিবার ও মামলার বাদীপক্ষ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।
নিহতের পিতা তারা মিয়া ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে বলেন, "জামিনে এসে ইমরান আমাদের নানাভাবে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। সে দম্ভ করে বলছে আমরা এক টাকা খরচ করলে সে একশো টাকা খরচ করবে, আমরা কীভাবে বিচার পাই তা সে দেখে ছাড়বে। এ সংক্রান্ত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও রয়েছে। সে প্রকাশ্যেই জামিনের শর্ত লঙ্ঘন করছে। ন্যায়বিচারের স্বার্থে আমরা অবিলম্বে তার জামিন বাতিল করে তাকে পুনরায় কারাগারে পাঠানোর দাবি জানাচ্ছি।" অভিযুক্ত ইমরান হোসেন তার বিরুদ্ধে ওঠা হুমকি ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন,' আত্মহত্যার ঘটনাটিকে হত্যাকাণ্ড দাবি করে আমার শ্বশুর বাড়ির লোকজন আমাকে হয়রানি করার চেষ্টা করছে।' বিষয়টি সম্পর্কে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মুন্সীগঞ্জ ডিবি পুলিশের উপ-পরিদর্শক মো. হাসিব আহমেদ বলেন, ' আমাদের তদন্ত কার্যক্রম প্রায় শেষ পর্যায়ে। শীঘ্রই আমরা প্রতিবেদন কোর্টে জমা দিব।'