মাদকের ভয়াবহ ছোবল থেকে দেশের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা এবং মাদক কারবারিদের আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্ক গুঁড়িয়ে দিতে নজিরবিহীনভাবে কঠোর অবস্থান নিতে যাচ্ছে সরকার। জানা যায়, দেশে বর্তমানে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ বিভিন্ন ধরনের মাদকে আসক্ত, যার একটি বড় অংশই অতি বিপজ্জনক সিনথেটিক ও সেমি-সিনথেটিক মাদকের মরণজালে বন্দি। এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেবল প্রথানুগত অভিযানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আইনি কাঠামো, বিচার প্রক্রিয়া এবং মাঠপর্যায়ের অভিযানিক সক্ষমতায় আমূল পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে মাদক সিন্ডিকেটের সশস্ত্র প্রতিরোধ ভাঙতে দীর্ঘদিনের নীতিগত বাধা পেরিয়ে অবশেষে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) কর্মকর্তাদের হাতে অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র তুলে দিচ্ছে সরকার। একই সঙ্গে বিচারিক গতি বাড়াতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনকে আরও কঠোর করতে চলতি সংসদ অধিবেশনেই সংশোধনী বিল উত্থাপনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি চলছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এত দিন কোনো ধরনের আত্মরক্ষামূলক অস্ত্র না থাকায় সম্পূর্ণ নিরস্ত্র অবস্থায় জীবন বাজি রেখে এবং পুলিশের সহযোগিতার ওপর নির্ভর করে মাদকবিরোধী ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান পরিচালনা করতে হতো ডিএনসি সদস্যদের। এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত মাদক কারবারিরা প্রায়ই ডিএনসি সদস্যদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালাত। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বিগত বছরগুলোতে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনাকালে এই নিরস্ত্র কর্মকর্তাদের ওপর আকস্মিক গুলিবর্ষণে ও হামলায় অধিদপ্তরের অন্তত ১২৫ জন সদস্য গুরুতর আহত হয়েছেন এবং দুজন প্রাণ হারিয়েছেন। সমপ্রতি সায়দাবাদ বাস টার্মিনাল এলাকায় অভিযানে গিয়ে মাদকচক্রের গুলিতে পরিদর্শক সিদ্দিকুর রহমানের গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা এই চরম নিরাপত্তাহীনতাকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে। এই পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে অবশেষে ডিএনসি কর্মকর্তাদের জন্য ৯ এমএম আধা-স্বয়ংক্রিয় পিস্তল ব্যবহারের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে রাজশাহীর সারদা পুলিশ একাডেমিতে বিশেষ ৩৫ দিনব্যাপী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ২৬০ জন কর্মকর্তাকে অস্ত্রচালনায় দক্ষ করে তোলা হয়েছে এবং প্রতিরক্ষা ক্রয় মহাপরিদপ্তরের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে ২৭৫টি পিস্তল কেনার টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। নিজস্ব সুরক্ষিত অস্ত্রাগার গড়ে না ওঠা পর্যন্ত সাময়িকভাবে এই অস্ত্রগুলো জেলা প্রশাসকের ট্রেজারি বা স্থানীয় থানার অস্ত্রাগারে সংরক্ষিত থাকবে। তবে মাঠপর্যায়ে অস্ত্রের এই ব্যবহারের ক্ষেত্রে সরকার অত্যন্ত কঠোর ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করেছে, যেখানে স্পষ্ট করা হয়েছে যে আগ্নেয়াস্ত্র হবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ‘একমাত্র সর্বশেষ পন্থা’। নীতিমালার নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো অভিযানে গিয়ে মাদক কারবারিদের মুখোমুখি হলে প্রথমেই এলোপাথাড়ি গুলি চালানো যাবে না; প্রথমে লাঠিচার্জ বা অস্ত্রের বাঁট দিয়ে ন্যূনতম বলপ্রয়োগের চেষ্টা করতে হবে। তাতে কাজ না হলে হ্যান্ডমাইকে ঘোষণা দিয়ে আকাশের দিকে ফাঁকা গুলি ছুড়তে হবে। এর পরও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে সর্বোচ্চ আত্মরক্ষার্থে এবং আসামি গ্রেফতারের স্বার্থে মাদক কারবারির কোমরের নিচে বা পায়ে সরাসরি একটি গুলি চালানো যাবে। ঘনবসতিপূর্ণ বা আবাসিক এলাকায় নিরপরাধ মানুষের জীবন যেন ঝুঁকিতে না পড়ে, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পাশাপাশি প্রতিটি গুলিবর্ষণের ঘটনার যৌক্তিকতা পরবর্তী সময়ে মহাপরিচালকের কাছে জবাবদিহি করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট থানায় তাৎক্ষণিক এজাহার দায়ের করতে হবে। এদিকে, সরকারের এই কঠোর অবস্থানের আরেকটি বড় প্রতিফলন ঘটছে বিচার বিভাগে। তথ্য অনুযায়ী, কেবল ঢাকাতেই বর্তমানে প্রায় ৮০ হাজার মাদকসংক্রান্ত মামলা ঝুলে রয়েছে, যা প্রচলিত আদালত ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত নিষ্পত্তি করা অসম্ভব। এই দীর্ঘসূত্রতা কাটাতে এবং অপরাধীদের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে সরকার বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠিয়েছে। একই সঙ্গে বর্তমান আইনের সীমাবদ্ধতা দূর করে এটিকে আরও যুগোপযোগী করতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনের কাজ চলছে, যা দ্রুতই আইন আকারে পাস হতে পারে। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ে সংস্থাটি প্রায় ৩ কোটি ৬১ লাখ ইয়াবা, ২৫০ কেজি হেরোইন, ২২ কেজি কোকেন ও বিপুল পরিমাণ ফেনসিডিল-গাঁজা জব্দ করার পাশাপাশি ২ লাখ ৭৪ হাজারের বেশি মামলা দায়ের করলেও বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতির কারণে মূল হোতারা অনেক সময় পার পেয়ে যায়; নতুন ট্রাইব্যুনাল ও আইন এই শূন্যতা পূরণ করবে। এদিকে, অপরাধ দমনের পাশাপাশি মাদকাসক্তদের নিরাময় ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে সমাজে ফিরিয়ে আনার মানবিক দিকটিতেও সরকার সমান্তরালভাবে জোর দিচ্ছে। দেশের সাতটি বিভাগীয় শহরে ১ হাজার ৪১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০০ শয্যাবিশিষ্ট অত্যাধুনিক মাদকাসক্ত নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র নির্মাণের মেগা প্রকল্প শুরু হয়েছে। এর পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগকে উৎসাহিত করতে দেশের ৭৩টি বেসরকারি নিরাময় কেন্দ্রকে সরকারি তহবিল থেকে অনুদান দেওয়া হচ্ছে। অপরাধ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, বাংলাদেশে মাদক সমস্যা এখন কেবলই একটি সাধারণ অপরাধ নয়, এটি জনস্বাস্থ্য ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক নীরব ঘাতক। তাই ডিএনসিকে সশস্ত্র করা, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং আইন সংশোধনের মতো সরকারের এই ত্রিমুখী কঠোর উদ্যোগের পাশাপাশি যদি সীমান্ত দিয়ে মাদকের অবৈধ প্রবেশ পথগুলো সম্পূর্ণ সিলগালা করা যায়, তবেই কেবল এই বিপুল আসক্ত জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করে একটি মাদকমুক্ত সমাজ বিনির্মাণ সম্ভব হবে।