কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলার দাবি, মধ্যপ্রাচ্যে বাড়ছে যুদ্ধের উত্তাপ

আল জাজিরা | প্রকাশ: ২১ জুলাই, ২০২৬, ১১:৪৪ এএম
কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলার দাবি, মধ্যপ্রাচ্যে বাড়ছে যুদ্ধের উত্তাপ
ছবি: আল জাজিরা

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়ে রাডার, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ড্রোন হ্যাঙ্গারসহ বিভিন্ন সামরিক অবকাঠামো ধ্বংসের দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস, আইআরজিসি। একই সময়ে ইরানে টানা দশম রাতের মতো হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগর পর্যন্ত নতুন করে ছড়িয়ে পড়েছে উত্তেজনা।

আল জাজিরা জানায়, কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলার দাবি করেছে আইআরজিসি। ইরানের আধা-সরকারি বার্তাসংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সির প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি দূরপাল্লার রাডার কেন্দ্র, টেলিযোগাযোগ কেন্দ্র, স্যাটেলাইট সিগন্যাল গ্রহণ ব্যবস্থা এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা রাডার লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।

আইআরজিসির দাবি, আলি আল-সালেম বিমানঘাঁটির একটি এমকিউ-৯ ড্রোন হ্যাঙ্গারেও হামলা চালানো হয়েছে। এতে কয়েকটি ড্রোন ধ্বংস অথবা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরে দেওয়া আরেক বিবৃতিতে ইরানি বাহিনী জানায়, আহমেদ আল-জাবের ঘাঁটির আগাম সতর্কীকরণ রাডার, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা রাডার, এফপিএস-১১৭ রাডার, প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং আকাশ প্রতিরক্ষা স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থাও হামলার লক্ষ্য ছিল।

আইআরজিসি বলেছে, পরবর্তী ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার আগে ওই অঞ্চলের রাডার নজরদারি দুর্বল করতেই এসব অভিযান চালানো হয়েছে। ইরানের সেনাবাহিনীও জানিয়েছে, ‘কামিকাজে ড্রোন’ ব্যবহার করে কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে।

তাসনিমের প্রকাশিত বিবৃতি অনুযায়ী, ক্যাম্প আরিফজানের প্রশাসনিক ভবন ও দিকনির্ণয়কারী অ্যান্টেনা, ক্যাম্প আল-আদিরির হেলিকপ্টার পার্কিং এলাকা এবং আহমেদ আল-জাবের ঘাঁটির সেনা সদস্যদের আবাসন লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। তবে এসব দাবির স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এরই মধ্যে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলাও অব্যাহত রয়েছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, সোমবার, ২০ জুলাই রাতে ইরানের সিরিক, বন্দর আব্বাস, কেশম দ্বীপ, শিরাজ ও ইসফাহানে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড, সেন্টকম জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার সক্ষমতা কমিয়ে দিতে ইরানের সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে অভিযান চালানো হয়েছে।

সেন্টকমের দাবি, ইরানের সামরিক কমান্ড সেন্টার, সামুদ্রিক সক্ষমতা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণস্থল এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। এর পাল্টা হিসেবে কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলার দাবি করে আইআরজিসি।

এই উত্তেজনার মধ্যেই হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। সোমবার, ২০ জুলাই গ্রিসের মালিকানাধীন দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার খবর পাওয়া যায়। যুক্তরাজ্য মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস, ইউকেএমটিও জানিয়েছে, ওমানের বন্দরনগরী লিমাহ উপকূলের কাছেও আরেকটি ট্যাংকারে হামলা হয়েছে। পরে আরও দুটি তেলবাহী জাহাজে বিস্ফোরণ ও ব্যাপক আগুনের দাবি করেছে আইআরজিসি।

আল জাজিরা জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা শুরুর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, মার্কিন সেনাদের ওপর ইরানের যেকোনো হামলার জবাব ‘বহুগুণ বেশি’ শক্তি দিয়ে দেওয়া হবে। এর আগে শুক্রবার, ১৭ জুলাই জর্ডানে একটি মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুই মার্কিন সেনা নিহত এবং একজন নিখোঁজ হন। একই সময়ে উত্তর ইরাকে আরও এক মার্কিন সেনা নিহত হন।

অন্যদিকে, ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী সৌদি আরবের বিরুদ্ধে অবরোধ ঘোষণা করেছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। চার বছর ধরে তুলনামূলক শান্ত থাকা ইয়েমেন সংঘাত নতুন করে জেগে উঠতে পারে বলেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে লোহিত সাগরের নৌপথেও নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল এবং ইয়েমেনের নতুন অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে সামরিক সংঘাতের প্রভাব উপসাগরীয় অঞ্চল ছাড়িয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।