বজ্রপাতের পূর্বাভাস মাঠ পর্যায়ে না পৌঁছানোয় বাড়ছে প্রাণহানি

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ২৪ জুলাই, ২০২৬, ০৮:০৫ এএম
বজ্রপাতের পূর্বাভাস মাঠ পর্যায়ে না পৌঁছানোয় বাড়ছে প্রাণহানি

বজ্রপাত ও তীব্র বজ্রঝড়ের আগাম পূর্বাভাস দেওয়ার সক্ষমতা আগের চেয়ে অনেক বাড়িয়েছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর। আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে এখন বজ্রঝড় শুরু হওয়ার এক থেকে চার ঘণ্টা আগেই নিখুঁত পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। তবে এই উন্নত ব্যবস্থার সুফল এখনো অধরাই রয়ে গেছে দেশের সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা সাধারণ কৃষক, জেলে ও খোলা জায়গায় কাজ করা শ্রমজীবী মানুষের কাছে। মূলত ‘লাস্ট মাইল কমিউনিকেশন’ বা শেষ ধাপে প্রান্তিক মানুষের কাছে সময়মতো সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়ার কার্যকর কোনো মাধ্যম না থাকায় উন্নত পূর্বাভাস ব্যবস্থা থাকার পরও দেশজুড়ে বজ্রপাতে প্রাণহানি আশঙ্কাজনক রূপ নিয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ বছরে দেশে বজ্রপাতে মোট ৩ হাজার ৮৬০ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। রিজিওনাল ইন্টিগ্রেটেড মাল্টি-হ্যাজার্ড আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেমের (রাইমস) গবেষণায় দেখা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে প্রতি এক হাজার বর্গকিলোমিটারে বজ্রপাতে মৃত্যুর হারে বাংলাদেশ শীর্ষে এবং বৈশ্বিক হিসাবে মৃত্যুর সংখ্যায় ভারতের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পরিস্থিতি বিবেচনা করে ২০১৬ সালে বজ্রপাতকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। বছরভিত্তিক তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০১৫ সালে দেশে ২২৬ জন মানুষ বজ্রপাতে মারা যান। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ আর বজ্রপাতের পূর্বাভাস তৈরি করা নয়, বরং সেই জীবনরক্ষাকারী তথ্য দ্রুততম সময়ে মাঠে কাজ করা মানুষের হাতের মুঠোয় পৌঁছে দেওয়া। অধিকাংশ সতর্কবার্তা বর্তমানে টেলিভিশন, আবহাওয়া অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা হলেও মাঠপর্যায়ের প্রান্তিক মানুষের বড় একটি অংশ এখনো ইন্টারনেট বা স্মার্টফোন সুবিধার বাইরে। তাছাড়া জাতীয় পর্যায়ে এখনো মোবাইল সেল ব্রডকাস্ট প্রযুক্তিনির্ভর জরুরি সতর্কবার্তা ব্যবস্থা চালু করা যায়নি, যা দুর্যোগের মুহূর্তে সবচেয়ে দ্রুত বার্তা পাঠাতে সক্ষম। এই যোগাযোগ বিভ্রাটের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডারস্টর্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরামের (এসএসটিএএফ) সাধারণ সম্পাদক রশিম মোল্লা জানান, প্রযুক্তি থাকলেও সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা মানুষের কাছে সরাসরি বার্তা পাঠানোর কোনো চ্যানেল গড়ে ওঠেনি। কৃষক তো মাঠে কাজ করার সময় টিভি দেখবে না বা ফোন ব্যবহার করবে না, আর আবহাওয়া অফিসের বিজ্ঞপ্তি গণমাধ্যমে প্রকাশ হতে হতে বজ্রপাতে মানুষের জানমাল শেষ হয়ে যায়। তিনি অতীতে তালগাছ রোপণ প্রকল্পের নামে হওয়া দুর্নীতির সমালোচনা করে বলেন, দেশে বজ্রপাত ঠেকানোর কার্যকর কোনো ব্যবস্থা বা লাইটনিং অ্যারেস্টার বসানোর প্রকল্প নেওয়া হয়নি। এই সংকট সমাধানে বজ্রপাতের হটস্পটগুলোতে বিশেষ কমিউনিটি সাইরেন এবং মসজিদের মাইক ব্যবহারের ওপর জোর দেন তিনি, যাতে মার্চ থেকে মে মাসের এই অতি ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে হাওরাঞ্চলসহ দেশের সব প্রান্তে মুহূর্তে খবর পৌঁছানো যায়। বিষয়টি নিয়ে জাতিসংঘও বৈশ্বিকভাবে সোচ্চার হয়েছে এবং মিসরের কপ-২৭ সম্মেলনে সংস্থাটির মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ২০২৭ সালের মধ্যে বিশ্বের সবাইকে আগাম সতর্কবার্তার আওতায় আনার ঘোষণা দিয়েছেন। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) এবং আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের (আইটিইউ) মতে, এই লক্ষ্য অর্জনে মোবাইল নেটওয়ার্কের সাথে ডিজিটাল সংযোগ ও সেল ব্রডকাস্ট প্রযুক্তির সমন্বয় করা জরুরি। এদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবে বায়ুমণ্ডল ক্রমান্বয়ে আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে, যার ফলে শক্তিশালী বজ্রঝড় এবং সাধারণের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতিকর বজ্রপাতের ঘটনা বাড়ছে। রাইমসের আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ খান মো. গোলাম রব্বানী জানান, দেশে বর্তমানে ‘কন্টিনিউইং কারেন্ট লাইটনিং’ বা দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ প্রবাহযুক্ত বজ্রপাতের ঘটনা মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ধরনের বজ্রপাত দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চমাত্রার বিদ্যুৎ বহন করে এবং এর তাপমাত্রা প্রায় ৫০ হাজার ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত হতে পারে, যা গাছপালাকে নিমেষেই দ্বিখণ্ডিত বা অগ্নিদগ্ধ করে ফেলে। একই সাথে বাড়ছে শক্তিশালী ধনাত্মক বা ‘পজিটিভ লাইটনিং’-এর ঘটনা, যা ঝড়ের মূল মেঘ থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে আঘাত হানতে পারে। ফলে আকাশ তুলনামূলক পরিষ্কার থাকলেও মানুষ হঠাৎ বজ্রপাতে আক্রান্ত হচ্ছে, যাকে সাধারণ মানুষ ‘বিনা মেঘে বজ্রপাত’ বলে থাকে। জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ জানান, আগে বজ্রপাত মূলত প্রাক-বর্ষা মৌসুমে সীমাবদ্ধ থাকলেও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে এখন পুরোদমে মনসুন বা বর্ষা মৌসুমেও এর প্রকোপ ও বজ্রমেঘের তীব্রতা বাড়ছে। গবেষকদের মতে, ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকা বজ্রপাতের সবচেয়ে বড় ডেঞ্জার জোন বা হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ, সুনামগঞ্জ সদর, বিশ্বম্ভরপুর, নেত্রকোনা এবং মৌলভীবাজারের বিস্তীর্ণ খোলা মাঠ ও জলাভূমিতে আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ কম থাকায় এখানে কাজ করা মানুষের মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। বিপরীতে ঝালকাঠি, পিরোজপুর, পটুয়াখালী ও ঝিনাইদহের মতো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলাগুলোকে তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ ‘কোল্ডস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর বাইরে সমাজজুড়ে বজ্রপাত নিয়ে এখনো অনেক বৈজ্ঞানিক ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। অনেকেই মনে করেন মোবাইল ফোন, হাতঘড়ি বা রাবারের জুতা সুরক্ষা দেয় অথবা আক্রান্ত ব্যক্তিকে স্পর্শ করলে নিজেও বিদ্যুতায়িত হওয়ার ঝুঁকি থাকে, যার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। চিকিৎসকদের মতে, আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে কোনো বিদ্যুৎ জমা থাকে না, তাই তাকে দ্রুত উদ্ধার করে সিপিআর দিলে অনেক ক্ষেত্রেই নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানো সম্ভব। এই সামগ্রিক বিপর্যয় মোকাবিলায় আবহাওয়া অধিদপ্তর ও দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা লাস্ট মাইল কমিউনিকেশন জোরদার করার পাশাপাশি পাঁচ দফা সুপারিশ তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে রয়েছে সেল ব্রডকাস্ট প্রযুক্তি চালুকরণ, স্বয়ংক্রিয় এসএমএস অ্যালার্ট, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্কের ব্যবহার, পাঠ্যপুস্তকে বজ্রপাত সচেতনতার অধ্যায় অন্তর্ভুক্ত করা এবং মাঠপর্যায়ে বিশেষ আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপনসহ আহতদের বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মমিনুল ইসলাম বলেন, আমাদের পূর্বাভাস দেওয়ার যান্ত্রিক সক্ষমতা আগের চেয়ে বহুগুণ উন্নত হয়েছে। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, ঝুঁকিতে থাকা মানুষের কাছে সময়মতো সেই সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া, যাতে তারা নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারেন। এজন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, স্থানীয় প্রশাসন এবং গণমাধ্যমকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে, কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের এই তীব্র সংকটের সময়ে প্রকৃত সাফল্য তখনই আসবে যখন মেঘের গর্জনের আগেই মাঠে কাজ করা মানুষের কাছে সতর্কবার্তা পৌঁছে যাবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে