বছরের প্রথম দিনে আংশিক বই দিয়ে বর্ণাঢ্য ‘বই উৎসব’ করার যে চেনা সংস্কৃতি বিগত বছরগুলোতে তৈরি হয়েছিল, তা থেকে সম্পূর্ণ বেরিয়ে আসার এক বড় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিগত বছরগুলোতে দেখা যায়, বছরের শুরুতে উৎসব করে বই বিতরণ করা হলেও সিংহভাগ শিক্ষার্থীই সব বিষয়ের বই একসঙ্গে পেত না। বড় বড় মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের মোট বরাদ্দের ৫০ বা ৬০ শতাংশ সরবরাহের কোটা পূরণ করতে মূলত ঢাকা বা বড় বড় শহরগুলোকে বেছে নিত। এর ফলে প্রান্তিক পর্যায়ের জেলা ও উপজেলাগুলোর লাখ লাখ শিক্ষার্থী সময়মতো পুরো সেট পাঠ্যবই থেকে বঞ্চিত হতো এবং বছরের প্রথমার্ধ জুড়েই তাদের আংশিক বই নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হতো। মুদ্রণকারীদের এই অপকৌশল এবং মাঠপর্যায়ের তদারকির অভাবে বছরের পর বছর ধরে কোটি কোটি কোমলমতি শিক্ষার্থীর পড়ালেখার স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হয়েছে। এই চেনা ও সনাতন সংকটাবর্ত থেকে বেরিয়ে এসে আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে দেশের প্রতিটি শিক্ষার্থীর হাতে একযোগে শতভাগ নতুন বই পৌঁছে দেওয়ার একটি সুনির্দিষ্ট ও সময়াবদ্ধ রোডম্যাপ নিয়ে কাজ শুরু করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। এনসিটিবির নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে দেশের প্রতিটি উপজেলায় সব শ্রেণির শতভাগ পরিমার্জিত বই পৌঁছে দেওয়ার জন্য মুদ্রণকারীদের কঠোর সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এবার মুদ্রণ প্রক্রিয়ার শুরুতেই স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, সব শ্রেণির অন্তত ৫০ শতাংশ বই দেশের প্রতিটি উপজেলায় আগে পৌঁছাতে হবে, যাতে কোনো সুনির্দিষ্ট এলাকা বৈষম্যের শিকার না হয়। মূল লক্ষ্য হচ্ছে, আগামী ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরপরই যেন দেশের প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থী সম্পূর্ণ নতুন বই হাতে নিয়ে ছুটির দিনে বাড়ি ফিরতে পারে। আর কোনো কারণে এই প্রাথমিক লক্ষ্য ব্যাহত হলে, দ্বিতীয় পরিকল্পনা হিসেবে আগামী বছরের ১ জানুয়ারির মধ্যেই সব বই বিতরণ সম্পন্ন করা নিশ্চিত করা হবে। এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রাক-প্রাথমিক থেকে শুরু করে প্রাথমিক, ইবতেদায়ী, মাধ্যমিক, দাখিল এবং কারিগরি স্তরের জন্য মোট ৩০ কোটি ৭১ লাখ ৯৮ হাজার ১০১ কপি পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণের দরপত্র প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে। এদিকে, অতীতে বই ছাপার কাজ শুরু হলেই বাজারে কাগজের দাম বাড়িয়ে এক ধরনের কৃত্রিম সংকট তৈরির অপচেষ্টা লিয়াজোঁ সিন্ডিকেটগুলোর মাধ্যমে দেখা যেত। এই ধরনের অনৈতিক বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং মুদ্রণকারীদের গাফিলতি মোকাবিলায় এবার সরকারের উচ্চপর্যায়ের সরাসরি নির্দেশনায় পিপিআর-২০২৫ অনুযায়ী একটি সুনির্দিষ্ট সময়সূচি ধরে কাজ পরিচালনা করা হচ্ছে। কাগজের মান ও জিপিএম ঠিক রাখা এবং মুদ্রণের গুণগত মান নিশ্চিত করতে এবার এনসিটিবির নিজস্ব বিশেষ মনিটরিং টিম মাঠপর্যায়ে কঠোর তদারকি করবে। একই সাথে পাঠ্যপুস্তকের গুণগত পরিবর্তনের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব ও ইতিহাসের বিকৃতি দূর করার ক্ষেত্রেও এবার অত্যন্ত দৃঢ় অবস্থান নেওয়া হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআর-এর শিক্ষাবিদ, কারিকুলাম বিশেষজ্ঞ ও দেশের শীর্ষস্থানীয় নিরপেক্ষ ইতিহাসবিদদের নিয়ে বিশেষ ওয়ার্কশপের মাধ্যমে বইয়ের কনটেন্ট পরিমার্জন করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে ভাষা আন্দোলনের প্রকৃত গোড়াপত্তন যেখানে ১৯৪৭ সালে হয়েছিল, তা বিগত সরকারের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ১৯৪৮ সালের প্রচারণা থেকে মুক্ত করে ‘সত্যনিষ্ঠভাবে’ তুলে ধরা হচ্ছে এবং ‘ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার অপচেষ্টা নস্যাৎ করে’ শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ‘ঘোষণা’ পাঠ্যবইয়ে যথাযথ মর্যাদায় ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। অন্যদিকে, তাত্ত্বিক পড়াশোনার একঘেয়েমি দূর করে শিক্ষাকে আনন্দময় করা এবং বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের মোবাইল ও ফেসবুক আসক্তি থেকে দূরে রাখার জন্য নতুন শিক্ষাবর্ষের কারিকুলামে বেশ কিছু যুগান্তকারী বৈচিত্র্যও যুক্ত করা হচ্ছে। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকেই চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে তিনটি সম্পূর্ণ নতুন বই যুক্ত হতে যাচ্ছে, যার মধ্যে চতুর্থ শ্রেণির জন্য ফুটবল, ক্রিকেট, দাবা, ব্যাডমিন্টন, সাঁতার, অ্যাথলেটিক্স ও কারাতে—এই সাতটি জনপ্রিয় খেলাকে অন্তর্ভুক্ত করে বিশেষ পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করা হচ্ছে। এছাড়া ষষ্ঠ শ্রেণিতে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বা আনন্দময় শিখন ও সংস্কৃতির বই অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, যা শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশে বড় ভূমিকা রাখবে। একই সাথে সমাজে কারিগরি শিক্ষার প্রতি বিদ্যমান সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বা ট্যাবু ভাঙতে এবং দেশের বেকারত্বের হার কমাতে শিক্ষিত যুবসমাজকে কর্মমুখী করার লক্ষ্যে ষষ্ঠ শ্রেণিতে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার ওপর বিশেষ কনটেন্ট ও অনুপ্রেরণামূলক সফলতার গল্প যুক্ত করা হচ্ছে। শিক্ষা প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তরের সমন্বয়ে এই নতুন বইগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলকভাবে প্রয়োগের রূপরেখা তৈরি হচ্ছে, যা পরবর্তীতে ২০২৮ সালের পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক কারিকুলাম বাস্তবায়নে ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।