দিনটি ছিলো চব্বিশ এর ২০ জুলাই, সময় সকাল ১০ টা হবে। ঢাকার উত্তর বাড্ডায় এ এম জেড হাসপাতালের সামনে স্বৈরাচার বিরোধী মিছিলে গলা ফাটিয়ে স্লোগান দিচ্ছিলো এমদাদুল। এমন সময় ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের ঘাতক পুলিশের একটি বুলেট কপাল ভেদ করে এ ফোঁড় ওফোঁড় হয়ে তাঁর জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দিলো। শহীদ হলেন মোঃ এমদাদুল। জুলাই শহীদ এমদাদুল পিরোজপুর জেলার ভান্ডারিয়া উপজেলার ধাওয়া গ্রামের মোঃ আবদুস সোবাহান ও হাসিনা বেগমের দুই ছেলের মধ্যে ছোট। রিক্সা চালক পিতার ছোট ছেলে এইচএসসি পাশ এমদাদ মাকে বলেছিলো ‘মা আমার দুটি সার্টিফিকেট আছে, আর দুটি সার্টিফিকেট হলে আমি একটা ভালো চাকুরী করতে পারবো’ বলে উচ্চ শিক্ষা লাভের আশায় ঢাকায় পাড়ি জমায়। কিন্তু ৮ সদস্যের পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম বাবা সোবাহান রোগাক্রান্ত হলে এমদাদুলের আর উচ্চ শিক্ষা লাভ সম্ভব হয়নি। সংসারের হাল ধরতে ড্রাইভিং জানা এমদাদুল ঢাকায় একটি প্রাইভেট কার চালানোর চাকুরী নেন।
ঢাকায় শুরু হয় ছাত্রদের কোটা বিরোধী আন্দোলন। সে আন্দোলন এক পর্যায়ে রূপ নেয় ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতনের আন্দোলনে। চারিদিকে গুলির আওয়াজ লাখো মানুষের স্লোগানে প্রকম্পিত ঢাকা। ফ্যাসিস্ট সরকার হটানোর আন্দোলনে যোগ দিতে তাগিত অনুভব করলো এমদাদ। অবশেষে সর্বস্তরের মানুষের ওই আন্দোলনে সহযোদ্ধা বন্ধু সজীবের সঙ্গে যোগ দেন আন্দোলনে। ২০ জুলাই ঘাতক পুলিশের ছোঁড়া বুলেটে শহীদ হন এমদাদুল।
শহীদ এমদাদুলের মা হাসিনা বেগম জানান, ‘আমাগো ৮ জনের পরিবারে কোনো জাগা জমি নাই। পরের জাগায় ঘর উডাইয়া থাহি। সামান্য বিষ্টি অইলেই ভাঙ্গা ঘরের চাল দিয়া ঘরে পানি পড়ে। এর মইদ্যে আমাগো কষ্ট কইররা থাকতে অয়।’
জুলাই শহীদ পরিবার হিসেবে সরকার থেকে মাসে বিশ হাজার টাকা ভাতা এবং ১০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র থেকে যে টাকা পায় তার একটি মোটা অংকের টাকা এমদাদুলের পিতার চিকিৎসায় ব্যয় হয়। পরিবারের খরচ মেটাতে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি এমদাদুলের বড় ভাই মোঃ হাসান এখন দিন মজুরের কাজ করে।
হাসিনা জানিয়েছেন, চব্বিশ সালে এমদাদ যখন শহীদ হয় তখন বিএনপি দুইবারে এক লাখ টাকা দেয় এবং জামায়াত দেয় দু’লাখ টাকা। এরপর জামায়াত প্রতি বছর ঈদে ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া ছাড়াও বিভিন্ন সময় সাহায্য সহযোগিতা করে। এমদাদুলের মৃত্যু বার্ষিকীতে জামায়াত ছাড়া অন্য কেউ খোঁজ নেয় না। হাসিনা জানিয়েছেন, এমপি আহমেদ সোহেল মঞ্জুর চব্বিশ সালে একবার আর নির্বাচনের সময় একবার আসছিলো। সরকারের কাছে কোনো দাবী আছে কিনা জানতে চাইলে হাসিনা বলেন, ‘আমাগো তো কোনো জাগা-জমি, ঘরবাড়ী নাই, সরকার যদি একটু জমি দেতো, হেলে মোরা ঘর বানাইয়া থাকতে পারতাম।’ ছেলে হত্যার বিচার বিষয়ে হাসিনা বলেন, তারা কোনো মামলা করেননি। শুনেছেন ঢাকায় মামলা হয়েছে। মাঝে মধ্যে ঢাকা থেকে তদন্তে লোক আসতো। তবে এমদাদুলের পরিবার তার হত্যার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান। বলেছেন, যারা এমদাদুলকে হত্যা করেছে তাদের ফাঁসি চান।