তীব্র পানি সঙ্কটে বরেন্দ্র অঞ্চল

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ২৬ জুলাই, ২০২৬, ০৮:১৮ এএম
তীব্র পানি সঙ্কটে বরেন্দ্র অঞ্চল

তীব্র পানি সঙ্কটে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বরেন্দ্র অঞ্চল। বর্তমানে বরেন্দ্র অঞ্চলের ৮২ শতাংশের বেশি এলাকা পানি সঙ্কটে রয়েছে। আর বর্তমানের প্রবণতা অব্যাহত থাকলে দু’দশকের মধ্যে ওই অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির মজুত সঙ্কটজনক পর্যায়ে পৌঁছাবে। বর্তমানে দ্রুত নিচে নামছে ওই অঞ্চলের পানির স্তর। ফলে গভীর নলকূপে অনেক এলাকাতেই আর উঠছে না আগের মতো পানি। বরং পানির স্তর কোথাও কোথাও ২০০ ফুটেরও বেশি নিচে নেমে গেছে। অথচ কয়েক দশক ধরে ভূগর্ভস্থ পানিই টিকিয়ে রেখেছিল ওই অঞ্চলের কৃষিকে। কিন্তু এখন দ্রুত নেমে যাচ্ছে ওই পানির স্তর। বিদ্যমান অবস্থায় বরেন্দ্র অঞ্চলের গ্রামবাসীর খাবারের পানি সংগ্রহই কষ্টকর হয়ে উঠেছে। আর বিস্তীর্ণ কৃষিজমি সেচের অভাবে অনাবাদি হয়ে পড়ছে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, তুলনামূলকভাবে দেশের বরেন্দ্র অঞ্চলে কম ও অনিয়মিত বৃষ্টি হয়। কৃষি উৎপাদনে লক্ষ্যে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) বিগত আশির দশক থেকে স্থাপন করে হাজার হাজার গভীর নলকূপ। আর ওসব নলকূপের পানি দিয়েই খরাপ্রবণ ওই অঞ্চলে শুরু হয় বোরো ধান, গম, ভুট্টা ও বিভিন্ন সবজির আবাদ। কিন্তু অতিরিক্ত পানি উত্তোলন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং বৃষ্টি কমে যাওয়ার কারণে বরেন্দ্র অঞ্চলে প্রতিস্থাপন হচ্ছে না ভূগর্ভস্থ পানি।

সূত্র জানায়, বরেন্দ্র অঞ্চলে বিগত ১৯৮৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ২৬ থেকে ৩০ ফুট নিচে ছিল পানির স্তর। ১৯৯৪ সালে তা ৩৫ ফুটে নেমে যায়। আর ২০০৪ সালে ৫১ ফুট এবং ২০১৩ সালে তা ৬০ ফুটে পৌঁছে। বর্তমানে বহু এলাকায় পানির স্তর ৮০ থেকে ৯০ ফুটেরও নিচে। কোথাও কোথাও ১১৩ ফুটের বেশি খনন করেও পানি মিলছে না। পরিস্থিতির অবনতি ঘটায় সরকার গত বছর রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ২৫ উপজেলার ৪৭টি ইউনিয়নের এক হাজার ৪৬৯টি মৌজাকে ‘অতি উচ্চ পানি সংকটাপন্ন’ এলাকা ঘোষণা করে। তাছাড়া ৮৮৪টি মৌজাকে ‘উচ্চ পানি সংকটাপন্ন’ এবং এক হাজার ২৪০টি মৌজাকে ‘মধ্যম মাত্রার পানি সংকটাপন্ন’ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করে। ওসব এলাকার আয়তন প্রায় দুই হাজার ৭৮৭ বর্গকিলোমিটার আর সেখানে পানি সঙ্কটে ভুগছে প্রায় ২১ লাখ পাঁচ হাজার মানুষ। পানি আইন-২০১৩ অনুযায়ী, ওসব এলাকায় খাওয়ার পানি ছাড়া অন্য কোনো কাজে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। নতুন নলকূপ স্থাপনেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।  কিন্তু অনেক এলাকাতেই অব্যাহত রয়েছে ভূগর্ভস্থ পানি তোলা। 

সূত্র আরো জানায়,পানি সংকটের প্রভাব সরাসরি কৃষিতে পড়ছে। সরকারি নির্দেশনায় ওই অঞ্চলে সর্বোচ্চ ১১ হাজার ৪০০ গভীর নলকূপের অনুমতি থাকলেও বাস্তবে স্থাপন করা হয়েছে ব্যক্তিমালিকানায় হাজার হাজার শ্যালো ও গভীর নলকূপ। বরেন্দ্র অঞ্চলের তিন জেলায় বসানো হয়েছে ৬২ হাজার শ্যালো টিউবওয়েল ও প্রায় ৪ হাজার গভীর নলকূপ। ওসব নলকূপের পানি তোলার সক্ষমতা প্রায় ২৮ হাজার গভীর নলকূপের সমান। অথচ জলবায়ু সহনশীলতা গড়ে তুলতে শুধু নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা বাড়ালেই হবে না। পাশাপাশি পানিসাশ্রয়ী সেচব্যবস্থা, জলবায়ু সহনশীল ফসল, জলবায়ু সহায়ক কৃষি এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ করতে হবে।

এদিকে এ প্রসঙ্গে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ড. মো. আবুল কাসেম জানান, বরেন্দ্র অঞ্চলে ব্যক্তিমালিকানাধীন নলকূপের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ভূগর্ভস্থ পানির ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ বেড়েছে। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী, ওই এলাকায় সর্বোচ্চ ১১ হাজার ৪০০টি নলকূপ থাকার কথা। তার মধ্যে বিএমডিএ পরিচালনা করছে ৮ হাজার ৪০০টি। কিন্তু ব্যক্তিমালিকানায় পরিচালিত নলকূপের সংখ্যা প্রায় ২৮ হাজারে পৌঁছেছে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে