বাংলাদেশ আর্মি স্টেডিয়ামে হাজারো শিশুর ভিড়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিকে দুই হাত বাড়িয়ে দেওয়া হাসিমুখের সেই কিশোর তাহসিন আব্দুল্লাহ এবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করেছে। বুধবার (২৯ জুলাই) বাবা নাজমুল হককে সঙ্গে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে সে। সেখানে তাহসিনের পড়াশোনা, ভবিষ্যৎ স্বপ্ন ও শখের কথা জানতে চান প্রধানমন্ত্রী। উপহার হিসেবে দেন নিজের স্বাক্ষর করা একটি বাস্কেটবল ও একটি ড্রোনসেট।
তাহসিনকে ঘিরে আগ্রহের শুরু ২৭ জুলাই। ওই দিন রাজধানীর বাংলাদেশ আর্মি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস ২০২৫-২৬’-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী মাঠ প্রদক্ষিণ করছিলেন। এ সময় স্কুলড্রেস পরা তাহসিন দুই হাত বাড়িয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে। তার মুখের নির্মল হাসির সেই মুহূর্তের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সাড়া পড়ে।
তবে সেই হাসির আড়ালে রয়েছে গভীর এক বেদনার গল্প। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে উত্তরার মাইলস্টোন স্কুলে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় বড় বোন তাসনিয়াকে হারায় তাহসিন। একই স্কুলে পড়লেও দুর্ঘটনার দিন তারা ছিল আলাদা ভবনে। তাহসিন তখন ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী, আর তাসনিয়া পড়ত অষ্টম শ্রেণিতে। যুদ্ধবিমানটি আছড়ে পড়ে তাসনিয়াদের ভবনে।
বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শুনে বোনকে খুঁজতে ছুটে যায় তাহসিন। আহতদের স্যালাইন ও পানি প্রয়োজন, এমন কথা শুনে সেগুলো নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সে। কিন্তু সেই অপেক্ষার শেষ হয়নি। প্রিয় বোনকে আর ফিরে পায়নি তাহসিন।
দুর্ঘটনার পর অনেকটাই বদলে যায় তার জীবন। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, এক হিলিং সেশনে নিজের কষ্টের কথা লিখেছিল তাহসিন। সেখানে সে লিখেছিল, ‘আমার কষ্ট অনেক। আমি আমার প্রিয় বোনকে হারিয়ে ফেলেছি। সে মারা গেছে। ওকে আমি অনেক অনেক মিস করি। ও আমার বেস্ট ফ্রেন্ড।’
বোনকে হারানোর পর তাহসিনের মুখে আগের মতো প্রাণখোলা হাসি দেখা যেত না। সেই শিশুটিই ২৭ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর কাছাকাছি আসার মুহূর্তে যেন হঠাৎ অন্যরকম হয়ে ওঠে। তার চোখেমুখের আনন্দ ধরা পড়ে ক্যামেরায়। ছবিটি ছড়িয়ে পড়ার পর প্রধানমন্ত্রী জানতে পারেন, এই হাসিমাখা শিশুটির জীবনে রয়েছে বোন হারানোর গভীর বেদনা।
এরপর প্রধানমন্ত্রী তাঁর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনকে তাহসিন ও তার পরিবারের খোঁজ নিতে নির্দেশ দেন। সেই ধারাবাহিকতায় বুধবার (২৯ জুলাই) প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাহসিনের সাক্ষাৎ হয় বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব গাজী শাহরিয়ার পামির।
সাক্ষাতে তাহসিনের পড়াশোনার খোঁজ নেন প্রধানমন্ত্রী। বর্তমানে সপ্তম শ্রেণিতে পড়া তাহসিনকে তিনি জানতে চান, বড় হয়ে সে কী হতে চায়। জবাবে তাহসিন জানায়, তার স্বপ্ন একজন সফল ব্যবসায়ী হওয়া। পাশাপাশি এমন কিছু করতে চায়, যার মাধ্যমে মানুষের উপকার করা যাবে এবং মানুষও যার প্রতি আকৃষ্ট হবে।
তাহসিনের স্বপ্নের প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী। মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া, নিয়মিত খেলাধুলা এবং নিজের লক্ষ্য পূরণে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার পরামর্শ দেন তাকে।
আলাপচারিতায় তাহসিন জানায়, ফুটবল খেলা তার শখ। তবে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে উপহার হিসেবে সে পায় একটি বাস্কেটবল ও একটি ড্রোনসেট। বাস্কেটবলে প্রধানমন্ত্রীর নিজের স্বাক্ষরও ছিল।
সাক্ষাৎ শেষে উচ্ছ্বসিত তাহসিন জানায়, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আবার দেখা করতে পেরে সে খুবই আনন্দিত। এমন সুযোগ পাবে, তা সে কল্পনাও করেনি। পুরো বিষয়টি তার কাছে ছিল ‘সারপ্রাইজ’। স্কুলে ফিরে বন্ধুদের কাছে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা হওয়ার গল্প শোনানোর জন্য সে অপেক্ষা করছে।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সময় তাহসিনকে তাঁর কার্যালয়ের বিভিন্ন কক্ষও ঘুরে দেখানো হয়। সেখানে রাখা গাড়ি ও জাহাজের রেপ্লিকা তার ভালো লাগে। বাবার মোবাইল ফোনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সেলফিও তোলে সে।
তাহসিনের বাবার সঙ্গে কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী। মাইলস্টোনের যুদ্ধবিমান দুর্ঘটনায় সন্তান হারানোর ঘটনায় নাজমুল হকের প্রতি গভীর সমবেদনা ও সহমর্মিতা জানান তিনি।
সাক্ষাতে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, একান্ত সচিব-২ মো. মেহেদুল ইসলাম, সহকারী একান্ত সচিব-২ আব্দুর রহমান সানী, সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাহ মুহাম্মদ আমান উল্লাহ, উপ প্রেস সচিব-১ জাহিদুল ইসলাম রনি এবং ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর সদস্যসচিব মোকছেদুল মোমিন মিথুন উপস্থিত ছিলেন।
তাহসিনের গল্পে তাই দুই রকম ছবি পাশাপাশি দেখা গেল। একদিকে প্রিয় বোনকে হারানোর গভীর শোক, অন্যদিকে সেই শোকের মধ্যেও ২৭ জুলাই আর্মি স্টেডিয়ামে প্রধানমন্ত্রীর দিকে দুই হাত বাড়িয়ে দেওয়া এক শিশুর নির্মল হাসি। আর সেই ছবির সূত্র ধরেই বুধবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হলো, যা তাহসিনের কাছে হয়ে থাকল এক নতুন স্মৃতি।