সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে বেসরকারি ক্লিনিকে নেওয়া, চিকিৎসকদের টেস্ট ও কমিশন বাণিজ্য এবং অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান অপারেশনের মতো অনিয়ম বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। একই সঙ্গে সরকারি হাসপাতালের দালাল চক্রের অপতৎপরতা স্থায়ীভাবে বন্ধ করার পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতের ক্রয় ও আর্থিক ব্যবস্থাপনাতেও নজরদারি বাড়ানোর কথা জানিয়েছেন তিনি।
বুধবার (২৯ জুলাই) রাজধানীর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে ‘বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ঘাটতি নিরসন: সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার উপযোগী সেবা নিশ্চিত করতে ব্যয় দক্ষতার একটি দ্রুত প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মূল্যায়ন’ শীর্ষক গবেষণার ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেন্ট রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট যৌথভাবে গবেষণাটি পরিচালনা করে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সরকারি হাসপাতালে দায়িত্ব পালন না করে বাইরে ক্লিনিক পরিচালনা, সেখানে অস্ত্রোপচার করা এবং রোগীদের নির্দিষ্ট ক্লিনিকে পরীক্ষা করাতে পাঠিয়ে কমিশন নেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। এসব বিষয় নিয়মিত মনিটর করা হবে বলেও জানান তিনি।
সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়ার দালাল চক্রের বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থানের কথা জানান সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, হাসপাতালকেন্দ্রিক এই দালাল চক্রের অপতৎপরতা স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হবে।
অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত গবেষণায় সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের বাজেট ব্যবস্থাপনা ও ব্যয়ের চিত্রও উঠে আসে। দেশের আটটি প্রশাসনিক বিভাগের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও তৃতীয় পর্যায়ের ২২টি সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে গবেষণাটি করা হয়। এতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়ন, সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত নথি এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্ষমতা পর্যালোচনা করা হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, জরিপভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সামগ্রিক বাজেট ব্যবহারের হার ছিল ৮৫ শতাংশ। মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলোতে এই হার সবচেয়ে কম, ৭৮ শতাংশ। অর্থবছর শেষে ৯৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে অব্যয়িত অর্থ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে মাত্র ১১ শতাংশ উত্তরদাতা আর্থিক অব্যবস্থাপনাকে উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, সাধারণ সরঞ্জাম খাতে বরাদ্দের মাত্র ২৭ শতাংশ ব্যয় হয়েছে। ভ্রমণ ও স্থানান্তরসংক্রান্ত খাতে ব্যয়ের হার ছিল ৬৮ শতাংশ এবং পেশাগত সেবা ও সম্মানী খাতে ৫৯ শতাংশ।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্য খাতে সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে অনিয়ম ও অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটার অভিযোগ তুলে ধরেন। টেন্ডার প্রক্রিয়ার অনিয়মের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, কখনো কখনো পছন্দের ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে এমন শর্ত দেওয়া হয়, যা অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের পক্ষেই পূরণ করা সম্ভব নয়।
উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, কোনো টেন্ডারে পাঁচ বছরে ১০ হাজার কোটি টাকার লেনদেনের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়। তাঁর প্রশ্ন, “সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম নেওয়া কয়জন ব্যবসায়ী এই শর্ত পূরণ করতে পারবে?” তাঁর মতে, এ ধরনের শর্তের মাধ্যমে প্রতিযোগিতা সীমিত করে নির্দিষ্ট পক্ষকে কাজ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়।
স্বাস্থ্য খাতে অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনার অভিযোগও তোলেন মন্ত্রী। তাঁর দাবি, আগের সরকারের সময়ে ১১ কোটি টাকা মূল্যের রেডিওথেরাপি মেশিন ১৮ কোটি টাকা দিয়ে দুটি কেনা হয়েছিল। কিন্তু যেসব স্থানে সেগুলো বসানো হয়, সেখানে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ছিল না। মন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, এর একটি ফরিদপুরে এবং অন্যটি খুলনায় পড়ে আছে।
কারিগরি জনবল না থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন স্থানে এক্স-রে ও অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার অভিযোগও করেন তিনি। এসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করে ফেলে রাখার ফলে শেষ পর্যন্ত ভাঙারির কাছে বিক্রি করা ছাড়া উপায় থাকে না বলেও মন্তব্য করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
হাম প্রতিরোধে টিকাদান নিয়েও কথা বলেন সাখাওয়াত হোসেন। তিনি দাবি করেন, ২০২০ সালের ডিসেম্বরের পর কয়েক বছর হাম প্রতিরোধে কোনো টিকাদান ক্যাম্পেইন হয়নি। ইউনিসেফের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হলেও টিকা সংগ্রহ করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে হাম আক্রান্ত শিশুদের ৯৯ শতাংশই টিকাবিহীন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় টিকাদান কর্মসূচি আরও জোরদার করা হয়েছে এবং সম্প্রতি এক লাখের বেশি নতুন শিশুকে এর আওতায় আনা হয়েছে।
ডায়ালাইসিস সেবায় খরচ কমানোর পরিকল্পনার কথাও জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, ঢাকাসহ চট্টগ্রামে ডায়ালাইসিস সেবায় একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে থাকা চুক্তির মেয়াদ নভেম্বরে শেষ হলে তা আর নবায়ন করা হবে না। এরপর সরকার নিজস্ব উৎস থেকে ডায়ালাইসিস মেশিন কেনার উদ্যোগ নেবে।
এতে ডিসেম্বরের শুরু থেকে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ কম খরচে ডায়ালাইসিস সেবা পাবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। একই সঙ্গে প্রতিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫০ শয্যার এবং প্রতিটি জেলা হাসপাতালে ১০ শয্যার ডায়ালাইসিস কেন্দ্র চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান।
স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে পরীক্ষামূলকভাবে নতুন উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলেন মন্ত্রী। তিনি জানান, দেশের ১০টি উপজেলা ও ৯০টি ওয়ার্ডে স্বাস্থ্যকর্মীদের সাইকেল, স্মার্টফোন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সুবিধাসম্পন্ন ‘কিট বক্স’ দেওয়া হবে। আগামী তিন মাসের মধ্যে এ কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে।
স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে উচ্চতা, ওজন, ডায়াবেটিস ও রক্তচাপ পরীক্ষা করবেন। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় যন্ত্রের মাধ্যমে লিপিড প্রোফাইল, আরবিসি ও সিবিসি পরীক্ষাও করা হবে। পুরুষদের কাছে পুরুষ স্বাস্থ্যকর্মী এবং নারীদের কাছে নারী স্বাস্থ্যকর্মী যাবেন বলে জানান তিনি।
সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবায় আর্থিক স্বচ্ছতার ওপরও জোর দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। অডিটের নামে ঘুষ না দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “অডিটে অনৈতিক টাকা চাইলেই দেওয়া বন্ধ করুন এবং সরাসরি আমার কাছে আসুন।” পরিস্থিতি যা-ই হোক, তিনি নিজে বিষয়টি মোকাবিলা করবেন বলেও জানান।
অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান অপারেশন বন্ধে তদারকি জোরদারের কথাও জানান মন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, সন্তানসম্ভবা নারীর পরিবারকে ভয় দেখিয়ে সিজারিয়ান অপারেশনে বাধ্য করার প্রবণতা রয়েছে কিছু প্রতিষ্ঠানে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধে সারাদেশে বেসরকারি ক্লিনিকে সারপ্রাইজ ভিজিট ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
সিভিল সার্জন ও জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সমন্বয়ে এসব তদারকি চলছে বলে জানান তিনি। প্রয়োজনীয় লেবার রুম, লেবার চেয়ার কিংবা নবজাতকের জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক সরঞ্জাম না থাকা সত্ত্বেও অস্ত্রোপচার চালানো কিছু ক্লিনিক ইতোমধ্যে বন্ধ করা হয়েছে বলেও জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এ অভিযান আরও জোরদার করা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
গবেষণায় ৯৫ জন কর্মকর্তার জ্ঞান, দৃষ্টিভঙ্গি ও পেশাগত চর্চা নিয়ে জরিপ করা হয়। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপক, জাতীয় পর্যায়ের নীতিনির্ধারক, সরবরাহকারী, শিক্ষাবিদ ও রোগীদের সঙ্গে ৩২টি সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে গবেষণার ফল উপস্থাপন করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। স্বাগত বক্তব্য দেন স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক ড. মো. এনামুল হক। এ সময় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক দিল আফরোজাসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।