রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। বুধবার (২৯ জুলাই) সন্ধ্যা ৬টার দিকে রাজধানীর গুলশানে নিজ বাসভবন থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ভিত্তিতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম।
গ্রেপ্তারের পর লতিফ সিদ্দিকীকে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়েছে। ডিবি প্রধান জানিয়েছেন, আগামীকাল বৃহস্পতিবার তাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হবে।
এর আগে বুধবার সকালে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানার আদালতে শাহবাগ থানার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় হাজিরা দিতে যান লতিফ সিদ্দিকী। আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তিনি ১০ নম্বর আসামি।
লতিফ সিদ্দিকী বলেন, ওই মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির কথা সকালে তাকে জানানো হয়েছে। তিনি আদালতে না এলে আত্মগোপনে চলে গেছেন বলে মনে হতে পারে, এমন আশঙ্কা থেকেই হাজিরা দিতে এসেছেন বলেও জানান। পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার না করলে আগামী রোববার বা সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গিয়ে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিলেন তিনি।
শাপলা চত্বরের ঘটনার সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, “আমি তখন মন্ত্রী ছিলাম। কিন্তু শাপলা চত্বরের ঘটনা বা সে সময়কার কোনো বিষয়ে আমি কিছু জানি না।”
২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা করা হয়েছে। এ মামলায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদসহ মোট ৪১ জনকে আসামি করা হয়েছে।
গত সোমবার (২৭ জুলাই) দুপুরে প্রসিকিউশনের দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এ আদেশ দেন। একই সঙ্গে শেখ হাসিনাসহ পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
মামলার ৪১ আসামির মধ্যে রয়েছেন শেখ হাসিনা, ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীর, শামসুল হক টুকু, হাসানুল হক ইনু, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, ড. আব্দুর রাজ্জাক, মাহবুবউল আলম হানিফ, হাসান মাহমুদ চৌধুরী, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, মৃনাল কান্তি দাশ, জাহাঙ্গীর কবির নানক, ডা. দীপু মনি, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, ওমর ফারুক চৌধুরী, সালাউদ্দিন মাহমুদ ও ডা. ইমরান এইচ সরকার।
এ ছাড়া মামলার আসামিদের তালিকায় রয়েছেন শাহরিয়ার কবির, মোজাম্মেল বাবু, ফারজানা রুপা, হাসান মাহমুদ খন্দকার, এ কে এম শহীদুল হক, জাবেদ পাটোয়ারী, বেনজীর আহমেদ, মোখলেসুর রহমান, জেনারেল আজিজ আহমেদ, জিয়াউল আহসান, মজিবুর রহমান, আব্দুল জলিল মন্ডল, শেখ মো. মারুফ হাসান, মাহবুব হোসেন, মনিরুল ইসলাম, আনোয়ার হোসেন, মুহা. আশরাফুজ্জামান, এস এম মেহেদী হাসান, হারুন-অর-রশীদ, বিপ্লব কুমার সরকার, সৈয়দ নুরুল ইসলাম, মো. আসাদুজ্জামান, এস এম শিবলী নোমান ও বি এম ফরমান আলী।
মামলায় বর্তমানে ৯ আসামি গ্রেপ্তার রয়েছেন বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। তাদের মধ্যে সাবেক মন্ত্রী ডা. দীপু মনি, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহিদুল হক, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির উপদেষ্টামণ্ডলীর সভাপতি শাহরিয়ার কবির, সাবেক ডিআইজি আবদুল জলিল মণ্ডল, সাংবাদিক ফারজানা রুপা ও মোজাম্মেল বাবুর নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
লতিফ সিদ্দিকী এর আগেও একটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত এই নেতা জুলাই অভ্যুত্থানের পর গত বছরের আগস্টে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে একটি অনুষ্ঠান থেকে গ্রেপ্তার হন। পরে পুলিশ তাকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় আসামি করে। কয়েক মাস পর তিনি জামিনে মুক্তি পান। ওই মামলার কার্যক্রম এখনো চলছে এবং তাকে নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা লতিফ সিদ্দিকী আওয়ামী লীগ থেকে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৯ সালে তাকে মন্ত্রী করা হয়। হজ নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে ২০১৪ সালে তাকে মন্ত্রিত্ব ছাড়তে হয় এবং আওয়ামী লীগ থেকেও বহিষ্কৃত হন তিনি।
২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন লতিফ সিদ্দিকী। একই বছর গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সংসদ বিলুপ্ত হলে তার সংসদ সদস্য পদও শেষ হয়।