বিশ্বকাপের মাঠে একের পর এক বিতর্কে জড়িয়েছে আর্জেন্টিনা। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে রাজনৈতিক বার্তা লেখা ব্যানার প্রদর্শন, বিভিন্ন ম্যাচে বৈষম্যমূলক স্লোগান ও অঙ্গভঙ্গির অভিযোগ, দর্শকদের মাঠে বস্তু ছোড়া এবং নিরাপত্তা ও ম্যাচ পরিচালনার নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগের পর এবার ফাইনাল শেষে সংঘর্ষের ঘটনাও যুক্ত হয়েছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ) ও কয়েকজন খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক শাস্তিমূলক কার্যক্রম শুরু করেছে ফিফা।
ফিফার বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ২০২৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রতিনিধি দলের কয়েকটি ম্যাচ ঘিরে বৈষম্যমূলক স্লোগান ও অঙ্গভঙ্গি, দেরিতে খেলা শুরু, ম্যাচ ও নিরাপত্তা প্রটোকল মেনে চলতে ব্যর্থতা, দল ও দর্শকদের অনুপযুক্ত বার্তা প্রদর্শন এবং দর্শকদের মাঠে বস্তু নিক্ষেপের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। শৃঙ্খলাবিধির ১৩ নম্বর ধারার ২(গ) উপধারা, ১৪, ১৫ ও ১৭ নম্বর ধারার সম্ভাব্য লঙ্ঘনের অভিযোগে এএফএর বিরুদ্ধে কার্যক্রম শুরু করেছে ফিফার ডিসিপ্লিনারি কমিটি।
তবে শাস্তির সিদ্ধান্ত এখনই হচ্ছে না। ফিফা জানিয়েছে, অভিযুক্তদের নিজেদের বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এএফএ ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য শোনার পরই ডিসিপ্লিনারি কমিটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবে।
সেমিফাইনালে রাজনৈতিক ব্যানার
আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে তদন্তের অন্যতম আলোচিত বিষয় ১৫ জুলাই আটলান্টায় ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনাল। ম্যাচটিতে ২-১ গোলে জয়ের পর আর্জেন্টিনার কয়েকজন খেলোয়াড় একটি ব্যানার হাতে নিয়ে উদযাপন করেন। সেখানে লেখা ছিল, ‘লাস মালভিনাস সন আর্জেন্টিনাস’, যার অর্থ, ‘ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ আর্জেন্টিনার।’
দক্ষিণ আটলান্টিকের ওই দ্বীপপুঞ্জকে ব্রিটিশরা ফকল্যান্ডস এবং আর্জেন্টাইনরা মালভিনাস নামে পরিচিত করে। অঞ্চলটির সার্বভৌমত্ব নিয়ে আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে।
১৯৮২ সালে এই দ্বীপপুঞ্জকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ হয়েছিল। ওই যুদ্ধে প্রায় ৬৫০ জন আর্জেন্টাইন, ২৫৫ জন ব্রিটিশ সেনা এবং তিনজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে জয় পায় যুক্তরাজ্য।
ফিফার স্টেডিয়াম আচরণবিধিতে রাজনৈতিক, আপত্তিকর বা বৈষম্যমূলক ব্যানার, পতাকা, লিফলেট, পোশাক কিংবা অন্য কোনো সামগ্রী প্রদর্শন নিষিদ্ধ। ফলে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের ওই ব্যানার প্রদর্শন ফিফার শৃঙ্খলাবিধির আওতায় এসেছে।
এটি অবশ্য প্রথমবার নয়। ২০১৪ সালের জুনে স্লোভেনিয়ার বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচের আগে একই বার্তা লেখা ব্যানার প্রদর্শন করেছিল আর্জেন্টিনা। সে ঘটনায় এএফএকে ২০ হাজার পাউন্ড জরিমানা করেছিল ফিফা।
শুধু ব্যানার নয়, আরও অভিযোগ
রাজনৈতিক ব্যানারকে ঘিরে বিতর্কের পাশাপাশি পুরো বিশ্বকাপজুড়ে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে আরও বেশ কিছু অভিযোগ জমা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বৈষম্যমূলক স্লোগান ও অঙ্গভঙ্গি, ম্যাচ দেরিতে শুরু করা, ম্যাচ ও নিরাপত্তা প্রটোকল মেনে চলতে ব্যর্থতা এবং দল ও দর্শকদের পক্ষ থেকে অনুপযুক্ত বার্তা প্রদর্শনের অভিযোগ।
কয়েকটি ম্যাচে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের বিরুদ্ধে মাঠে বোতলসহ বিভিন্ন বস্তু ছোড়ার অভিযোগও রয়েছে। এসব ঘটনাও ফিফার তদন্তের আওতায় এসেছে।
শৃঙ্খলাবিধির ১৩ নম্বর ধারায় খেলাধুলার অনুষ্ঠানকে অক্রীড়াসুলভ বা বাইরের প্রচারণার জন্য ব্যবহারের বিষয়টি, ১৪ নম্বর ধারায় দলের অসদাচরণ, ১৫ নম্বর ধারায় বৈষম্য ও বর্ণবাদী আচরণ এবং ১৭ নম্বর ধারায় ম্যাচের শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ফাইনালের পর মাঠে হাতাহাতি
আর্জেন্টিনার জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ তৈরি হয়েছে ১৯ জুলাই নিউজার্সিতে অনুষ্ঠিত ফাইনালের পর। অতিরিক্ত সময়ে ১-০ গোলে হেরে বিশ্বকাপ ধরে রাখার স্বপ্ন শেষ হয় আর্জেন্টিনার। ম্যাচ শেষে দুই দলের খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
ফাইনালের শেষ বাঁশি বাজার পর স্পেনের বদলি খেলোয়াড়েরা উদযাপনের জন্য মাঠে ঢুকে পড়েন। তখন আর্জেন্টিনার লিয়ান্দ্রো পারেদেস স্পেনের গাভিকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন এবং তার মুখে আঘাত করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্পেনের ডিফেন্ডার এরিক গার্সিয়ার সঙ্গেও পারেদেস সংঘর্ষে জড়ান।
আর্জেন্টিনার নাহুয়েল মলিনাকেও সংঘর্ষে জড়াতে দেখা যায়। তিনি স্পেনের রদ্রির ওপরও চড়াও হন বলে অভিযোগ রয়েছে। আর্জেন্টিনার সহকারী কোচ ও সাবেক অধিনায়ক রবার্তো আয়ালার বিরুদ্ধে স্পেনের দানি ওলমোকে আঘাত করার অভিযোগ উঠেছে।
এই ঘটনায় পারেদেস, মলিনা ও আয়ালার পাশাপাশি আর্জেন্টিনার থিয়াগো আলমাদা এবং স্পেনের গাভির বিরুদ্ধেও তদন্ত চলছে। আর্জেন্টিনার সাবেক ডিফেন্ডার ও বর্তমান কোচিং স্টাফ ওয়াল্টার সামুয়েলসহ দুই দলের আরও কয়েকজন সদস্য ওই সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছিলেন।
তদন্তের আওতায় পারেদেসের বিরুদ্ধে তিনটি, মলিনার বিরুদ্ধে দুটি এবং আয়ালার বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ রয়েছে। আলমাদা ও গাভির বিরুদ্ধেও খেলোয়াড়সুলভ আচরণবিরোধী একটি করে অভিযোগ রয়েছে।
ফিফার শৃঙ্খলাবিধি অনুযায়ী, এ ধরনের অপরাধে অন্তত এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা হতে পারে। সংঘর্ষের অভিযোগ প্রমাণিত হলে ন্যূনতম তিন ম্যাচের নিষেধাজ্ঞার বিধান রয়েছে।
ফাইনালের পর আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেসের বিরুদ্ধে গাভির মুখে আঘাত করার একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়লেও, ওই ঘটনায় এখনও আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেনি ফিফা।
বিশ্বকাপের শিরোপা হারানোর পর নতুন চাপ
নিউজার্সির ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে বিশ্বকাপ ধরে রাখার সুযোগ হারায় আর্জেন্টিনা। স্পেনের জন্য এটি ছিল ১৬ বছর পর বিশ্বকাপ জয়। ২০১০ সালের ফাইনালেও স্পেন ১-০ গোলে জিতেছিল এবং সেই ম্যাচও অতিরিক্ত সময়ে গড়িয়েছিল।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনার পথ অবশ্য ছিল দারুণ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। শেষ বত্রিশে কেপ ভার্দে ও মিসরের বিপক্ষে ৩-২ গোলে জয় পায় লিওনেল স্কালোনির দল। কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডকে হারায় ৩-১ গোলে।
আটলান্টার সেমিফাইনালেও শুরুতে এগিয়ে গিয়েছিল ইংল্যান্ড। ৫৫ মিনিটে গোল করে ইংল্যান্ডকে এগিয়ে দেন মরগান রজার্স। তবে শেষদিকে লিওনেল মেসির অ্যাসিস্টে এনসো ফের্নান্দেস ও লাউতারো মার্তিনেস গোল করে আর্জেন্টিনাকে ২-১ ব্যবধানে জয় এনে দেন।
সেই জয়ের পর রাজনৈতিক বার্তা লেখা ব্যানার প্রদর্শনের ঘটনাই এখন ফিফার তদন্তে বড় বিষয় হয়ে উঠেছে। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে ফাইনালের পর মাঠের সংঘর্ষ এবং পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ।
এখন এএফএ ও অভিযুক্ত খেলোয়াড়দের বক্তব্য শোনার পর সিদ্ধান্ত দেবে ফিফার ডিসিপ্লিনারি কমিটি। ফলে বিশ্বকাপের শিরোপা ধরে রাখতে না পারার হতাশার পাশাপাশি আর্জেন্টিনার সামনে এখন অপেক্ষা করছে আরেকটি বড় পরীক্ষা, ফিফার সম্ভাব্য শাস্তি।
বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ পাঁচবার শিরোপা জিতেছে ব্রাজিল। ইতালি ও জার্মানির রয়েছে চারটি করে শিরোপা। আর্জেন্টিনা তিনবার বিশ্বকাপ জিতেছে। উরুগুয়ের সমান দুটি শিরোপা রয়েছে স্পেনের। ইংল্যান্ডের একমাত্র বিশ্বকাপ জয় এসেছে ১৯৬৬ সালে।