বাংলাদেশে সৌদি আরবের বিনিয়োগ বাড়ানো এবং দুই দেশের কৌশলগত সহযোগিতা আরও জোরদারের বিষয়ে একমত হয়েছে বাংলাদেশ ও সৌদি আরব। বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, সি-ফুড, কৃষিভিত্তিক শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ সম্ভাবনাময় বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবে আরও দক্ষ বাংলাদেশি কর্মী নেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌদি আরবের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়ালিদ বিন আবদুল করিম আল-খুরাইজির বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও কৌশলগত, বহুমাত্রিক ও দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বে রূপ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের সম্পর্ক পারস্পরিক আস্থা ও দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। বর্তমান সরকার সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করে একটি কৌশলগত, বহুমাত্রিক ও দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে চায়।
বাংলাদেশে সৌদি বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ খাতের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এ খাতে সৌদি কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ দুই দেশের জন্যই লাভজনক হবে।
জবাবে সৌদি উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়ালিদ বিন আবদুল করিম আল-খুরাইজি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এ কারণে সম্ভাবনাময় বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা ও বিনিয়োগ বাড়াতে সৌদি আরব আগ্রহী।
তিনি জানান, বাংলাদেশে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, সি-ফুড, ট্রপিক্যাল ফুড, কৃষিভিত্তিক শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ দেখছে সৌদি আরব।
সৌদি আরবের উন্নয়নে বাংলাদেশি কর্মীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথাও বৈঠকে তুলে ধরেন সৌদি উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী। পাশাপাশি জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান নির্বাচিত হওয়ায় প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানান তিনি।
বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেওয়া এবং সহযোগিতা আরও বাড়ানোর বিষয়ে উভয় পক্ষ একমত হয়।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের আগে মঙ্গলবার সকালে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গেও বৈঠক করেন সৌদি উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়ালিদ বিন আবদুল করিম আল-খুরাইজি। এতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরসহ সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা অংশ নেন।
বৈঠকের পর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানান, বাংলাদেশে বিভিন্ন খাতে সৌদি বিনিয়োগ এবং সৌদি আরবে দক্ষ বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
তিনি বলেন, মৎস্য, খাদ্য, জ্বালানি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও তথ্যপ্রযুক্তির মতো বিভিন্ন খাতে সৌদি আরবের যে দক্ষতা রয়েছে, তা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে বিনিয়োগের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
সৌদি আরবে বসবাসরত বাংলাদেশিদের প্রসঙ্গও বৈঠকে উঠে আসে। যুদ্ধের সময় নিহত তিন বাংলাদেশির কথা উল্লেখ করে সৌদি পক্ষ তাঁদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেছে বলে জানান শামা ওবায়েদ। নিহতদের মরদেহ দেশে ফেরত আনতে সহায়তা করায় সৌদি আরবকে ধন্যবাদ জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশ থেকে আরও বেশি দক্ষ শ্রমিক নেওয়ার ব্যাপারে সৌদি আরব আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলেও জানান তিনি।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সৌদি আরব সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়টিও আলোচনায় আসে।
প্রধানমন্ত্রীর সৌদি সফর কবে হতে পারে, জানতে চাইলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী সফরের ব্যাপারে আগ্রহী। দুই দেশের আলোচনার ভিত্তিতে উপযুক্ত সময়ে এ সফর হবে।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের শেষেও সৌদি উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁকে সৌদি আরব সফরের আমন্ত্রণ জানান। প্রধানমন্ত্রী আমন্ত্রণের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে সুবিধাজনক সময়ে সৌদি আরব সফরের আশা প্রকাশ করেন।
বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে বিনিয়োগ সহযোগিতা আরও এগিয়ে নিতে শিগগির সৌদি আরবে দুই দেশের একটি যৌথ বৈঠক হওয়ার কথা জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান ওই বৈঠকে অংশ নেবেন।
এ ছাড়া ঢাকায় দুই দেশের রাজনৈতিক সংলাপ এবং জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকও শিগগির অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
সৌদি আরবে থাকা অনিবন্ধিত রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেওয়ার বিষয়েও জানতে চাওয়া হলে শামা ওবায়েদ জানান, রিয়াদ ও জেদ্দায় বাংলাদেশের মিশন বিষয়টি নিয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করছে। এ বিষয়ে দুই দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাসপোর্ট সংক্রান্ত কারিগরি দলও কাজ করছে বলে জানান তিনি।
সৌদি প্রতিনিধি দলে ছিলেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল সুলাইমান বিন আবদুলআজিজ আল-ইয়াহইয়া, কনস্যুলার বিষয়ক উপমন্ত্রী মোহাম্মদ আল-শাম্মারি, মানবসম্পদ ও সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী মুহান্নাদ বিন আহমেদ আল-ইসা, বাংলাদেশে নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ বিন আবিয়াহ এবং সৌদি পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশের পক্ষে বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ এবং প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির উপস্থিত ছিলেন।
সৌদি উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়ালিদ বিন আবদুল করিম আল-খুরাইজি দুই দিনের সফরে সোমবার রাতে ঢাকায় আসেন। মঙ্গলবার রাতেই তাঁর ঢাকা ছাড়ার কথা রয়েছে।