এানি লন্ডারিং আইনের ধারা বাতিলে আরো কমে যাচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) শক্তি। বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অধ্যাদেশ জারি করে মানি লন্ডারিং আইনের সাতটি ধারা (সম্পৃক্ত অপরাধ) দিয়ে দুদককে শক্তিশালী করেছিরো। কিন্তু জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে ওই অধ্যাদেশটি আইন হিসেবে পাস না হওয়ায় দুদক তদস্ত করতে পারছে না ওই সাতটি সম্পৃক্ত অপরাধ। বিগত ২০০২ সালে দেশে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন প্রণয়ন করা হয়। আর তখন থেকেই দুদককে আইনটির সব সম্পৃক্ত অপরাধ (ধারা) তদন্ত করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল। ওই সময় মানি লন্ডারিং অপরাধে কমিশনের মামলার সাজার হার ছিল শতভাগ। কিন্তু বিগত ২০১৫ সালে আইনটি সংশোধন করে দুদককে মাত্র একটি ধারা দুর্নীতি ও ঘুষ দেয়া হয়। কিন্তু গত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে দুদক-সংক্রান্ত কমিশনের প্রতিবেদনের আলোকে জারি করা অধ্যাদেশে সংস্থাটিকে দেয়া হয় মানি লন্ডারিং-সংক্রান্ত সাতটি ধারা। তখন আগের দুর্নীতি ও ঘুষ ধারাসহ মোট ৮টি ধারা হয়েছিলো। কিন্তু সংসদের প্রথম অধিবেশনে অধ্যাদেশটি আইন হিসেবে পাস না হওয়ায় দুদক এখন মানি লন্ডারিং-সংক্রান্ত একটি ধারা নিয়েই কাজ করতে হচ্ছে। তবে সরকার এরই মধ্যে দুদক আইন-২০০৪ সংশোধনের ঘোষণা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দুদক আইন ২০০৪ অনুসারে গঠন করা হচ্ছে দুদকের সর্বোচ্চ কাঠামো কমিশন। তাতে একজন চেয়ারম্যান, দুজন কমিশনার নিয়োগ করা হবে। ইতিপূর্বে পাঁচ সদস্যের কমিশন গঠন করার কথা বলে অধ্যাদেশও জারি করা হয়েছিলো। কিন্তু আইন পাস না হওয়ায় এখন পুরোনো নিয়মেই কমিশন হচ্ছে। ফলে দুদক চলবে পুরোনো ধারাতেই। বর্তমানে দুদক দণ্ডবিধির ৪২০ ধারায় প্রতারণা, জালিয়াতি-সংক্রান্ত অপরাধ তদন— করতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে দুদকের জন্য শর্ত রয়েছে শুধু সরকারি কর্মচারী ও ব্যাংকারের বিরুদ্ধে ওই অভিযোগ তদন্ত করা যাবে। ৪২০ ধারা অনুযায়ী সরকারি সম্পত্তি নিয়ে প্রতারণা, জালিয়াতির অভিযোগও তদন্ত করতে পারছে দুদক। তাছাড়া মানি লন্ডারিং আইনের প্রতারণা, জালিয়াতির যে ধারা দুদক ব্যবহার করে আসছিল, তাতে ওই অপরাধের সঙ্গে জড়িত সরকারি, বেসরকারি এমনকি দেশে সংঘটিত ওই অপরাধের সঙ্গে যুক্ত বিদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধেও তদন— করতে পারতো। কিন্তু এখন আর তা সম্ভব হবে না।
সূত্র জানায়, মানি লন্ডারিং আইনের পর্যাপ্ত ধারা ব্যবহার করতে না পারায় সংকুচিত হয়ে এসেছে দুদকের কাজের পরিধি। অথচ দুদকে আসে মানি লন্ডারিংবিষয়ক অনেক অভিযোগ। কিন্তু সেগুলো তপশিলভুক্ত না হওয়ায় তদন্ত করা যাচ্ছে না। বরং তদন্তের সুপারিশ করে ওসব অভিযোগ বিভিন্ন দপ্তরে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। আগে দুদক মানি লন্ডারিং আইনের প্রতারণা, জালিয়াতির ধারা ব্যবহার করতে পারায় ২০১২ সালে ডেসটিনি, ইউনিপে-২, যুবকসহ বেসরকারি খাতের নানা অভিযোগের তদন্তে সাড়া ফেলেছিল। বর্তমানে ওই ধারাগুলো ব্যবহার করতে না পারায় দুদক পানামা পেপার্সসহ বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে তদন্ত করতে পারছে না।
সূত্র আরো জানায়, অধ্যাদেশ জারি করে দুদককে যে ৭টি ধারা দেয়া হয়েছিল সেগুলো হলো দলিল-দস্তাবেজ জালকরণ, প্রতারণা, জালিয়াতি, দেশি ও বিদেশি মুদ্রা পাচার, চোরাচালানি ও শুল্ক-সংক্রান্ত অপরাধ, কর-সংক্রান্ত অপরাধ এবং পুঁজিবাজার সম্পর্কিত তথ্য-সংক্রান্ত অপরাধ। তার আগে ২০১৫ সালে আইন সংশোধন করে দুদককে মানি লন্ডারিং-সংক্রান্ত শুধু একটি ধারা ‘ঘুষ ও দুর্নীতি’ দেয়া হয়েছিল। তখন দুদকের ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে সরকারের অন্য ৬টি প্রতিষ্ঠানকে মানি লন্ডারিং আইনের বিভিন্ন ধারা তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়। ওই ৬টি প্রতিষ্ঠান হলো পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ কাস্টমস, পরিবেশ অধিপ্তর এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন।
এদিকে বিশেষজ্ঞদের মতে, দুদক-সংক্রান্ত কমিশনের প্রতিবেদনে মানি লন্ডারিং আইনের গুরুত্বপূর্ণ সাতটি ধারা দিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে শক্তিশালী করা হয়েছিল। এখন সংস্থাটির হাতে নেই সামান্য ক্ষমতাও। যদিও সরকার এরই মধ্যে দুদক আইন সংশোধনের ঘোষণা দিয়েছে। ওই আইন সংশোধনকালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ের কমিশনের প্রতিবেদন, সুপারিশগুলো গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিগত ২০১৫ সালে সংশোধনের আগ পর্যন্ত মানি লন্ডারিং আইনের ২৭টি ধারা ছিলো। পরে সাইবার ক্রাইম, পর্নোগ্রাফি অপরাধ যুক্ত হওয়ায় বর্তমানে মোট ২৯টি ধারা হয়েছে। ওই ২৯ ধারা থেকে অধ্যাদেশের মাধ্যমে দুদকের জন্য ৭টি ধারা যুক্ত করা হয়েছিল।
অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে দুদক সচিব মোহাম্মদ খালেদ রহীম জানান, অধ্যাদেশটি আইন হিসেবে পাস করা হয়নি বলে সম্পৃক্ত অপরাধগুলো রাখা হবে না বিষয়টা এমন নয়। সরকার প্রয়োজন মনে করলে যে কোনো সময় ওসব অপরাধ তদন্তের জন্য দুদক আইনে যুক্ত করতে পারে।