খুলনা ওয়াসার ৩'শ ৩৯ কোটি টাকার প্রকল্পের শুরুতেই বিতর্ক

এফএনএস (এম এ আজিম; খুলনা) : | প্রকাশ: ৮ আগস্ট, ২০২৬, ০৩:০৬ পিএম
খুলনা ওয়াসার ৩'শ ৩৯ কোটি টাকার প্রকল্পের শুরুতেই বিতর্ক

খুলনার ওয়াসার আলোচিত পানি সরবরাহ প্রকল্প ফেজ-২ এর প্রথম কার্যক্রম শুরুতেই আবার বিতর্কের মুখে পড়েছে। প্রকল্পের প্রথম প্যাকেজের চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সহযোগিতা এবং নেতিবাচক প্রতিবেদন ঠেকাতে সাংবাদিকদের প্রদানের কথা বলে এই টাকা নেওয়া হয়। সম্পূর্ণ লেনদেন সম্পন্ন করেছেন ওয়াসার বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফিরোজ শাহ। টাকা বন্টনের দায়িত্বে ছিলেন বিতর্কিত প্রকৌশলী রেজাউল ইসলাম। প্রায় ৩৩৯ কোটি টাকার (৩৮ কিলোমিটার ক্লিয়ার ওয়াটার ট্রান্সমিশন স্থাপন) এই ঠিকাদারি কাজটি পেয়েছে চীনের প্রতিষ্ঠান কনস্ট্রাকশন সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যুরো লিমিটেড (সিসিএসইবি) ও আরএফএল প্লাস্টিক লিমিটেড জয়েন্ট ভেঞ্চার। প্রতিষ্ঠানটি এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রায় ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার এই প্রকল্পের পরিচালক নিয়োগকে কেন্দ্র করে বদলী-পদায়ন, পাল্টাপাল্টি মব, ঘুষ লেনদেন, পত্রিকায় সংবাদ পরিবেশন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপসহ নানান ঘটনা ঘটেছে। এই প্রকল্পের জন্যই মন্ত্রণালয় থেকে বদলী হয়ে খুলনায় এসেছেন সরকারের প্রশাসন ক্যাডারের যুগ্ম সচিব ফিরোজ শাহ। গত ২৪ মে ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন তিনি। মূলত বিশাল অংকের এই প্রকল্পের ঠিকাদারি কাজ বন্টন নিয়ে আস্থাভাজন কর্মকর্তা হিসেবে তাকে এই পদে নিয়ে আসেন খুলনার এক জনপ্রতিনিধি। পরে তাকেই প্রকল্প পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। সারাদেশেই গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল প্রকৌশল কাজের পরিচালকের দায়িত্ব সিনিয়র প্রকৌশলীদের দেওয়া হয়। পূর্বের সব রীতি ভেঙে প্রশাসন ক্যাডারের এমন ব্যক্তিকে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যার এ কাজের কোনো ধরনের অভিজ্ঞতা নেই। অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ফিরোজ শাহ এর বিরুদ্ধে বদলী বাণিজ্য, ঘুষ নিয়ে বটিয়াঘাটার একটি খাস জমি জেএমআই নামে একটি গ্যাস কোম্পানিকে দিয়ে দেওয়া এবং সরকারি জমি সংক্রান্ত বিরোধ মেটাতে অর্থ বাণিজ্যের অভিযোগ ছিল। ওয়াসায় তাকে সহযোগিতার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউল ইসলামকে। এর আগে রেজাকেই প্রকল্পের পরিচালকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এনিয়ে সংবাদ প্রকাশ করায় তার নিয়োগ বাতিল করা হয়।

ওয়াসা থেকে জানা গেছে, খুলনা নগরীর পানি সংকট নিরসনে মধুমতি নদী থেকে পানি এনে পরিশোধনের পর সরবরাহ করতে পানি সরবরাহ প্রকল্প-১ বাস্তবায়ন করা হয়। ২০১৯ সালের ৩০ জুন ওই প্রকল্পের কাজ শেষ হয়। প্রথম প্রকল্পের মধ্যেই নগরীর বাকি এলাকায় পানি সরবরাহের জন্য দ্বিতীয় প্রকল্প নেওয়ার কথা উল্লেখ ছিল। সেই আলোকে ২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন হয় ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার খুলনা পানি সরবরাহ প্রকল্প ফেজ-২। এই প্রকল্পেও অর্থায়ন করেছে এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)।

সূত্রটি জানায়, বিশাল ব্যয়ের এই প্রকল্পের পিডি কে হবেন-এনিয়ে শুরু হয়ে দৌড়ঝাপ। শুরুতেই প্রকল্প তদারকির রুটিন দায়িৎ্েব ছিলেন ওয়াসার নির্বাহী প্রকৌশলী কামাল হোসেন। প্রথম প্রকল্পে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং অভিজ্ঞ হওয়ায় তাকে প্রকল্পের ফোকালপার্সন নিয়োগ করা হয়।

কিন্তু চলতি বছরের ১০ ডিসেম্বর ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কার্যালয়ে গিয়ে মব তৈরি করেন এনসিপি নেতারা। তারা নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউল ইসলামকে প্রকল্পের দায়িত্ব দিতে চাপ প্রয়োগ করেন। একই সঙ্গে বিএনপির এক কেন্দ্রীয় নেতাও রেজার পক্ষে জোরালো তদবির করেন। পরদিন ১১ ডিসেম্বর রেজাউল ইসলামকে প্রকল্প পরিচালকের রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের নেতা রেজাউল ইসলামের বিরুদ্ধে গভীর নলকূপ স্থাপন এবং আটরা রিজার্ভার নির্মাণে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। এছাড়া তিনি ছিলেন ছষ্ঠ গ্রেডের কর্মকর্তা, এ ধরনের কাজের অভিজ্ঞতা তার ছিল না। মূলত মন্ত্রণালয়ে ঘুষ এবং বিএনপির এক প্রতিনিধির সুপারিশে তিনি নিয়োগ পান। এনিয়ে ওয়াসার ভেতরে-বাইরে ক্ষোভ এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হওয়ায় গত ২৬ এপ্রিল তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এরপর প্রকল্পটির পরিচালক হতে তৎপরতা চালান বিএনপি সমর্থিত প্রকৌশলীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্সের (অ্যাব) নেতারা। 

এর মধ্যে গত ২৪ মে ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে যোগ দেন যুগ্ম সচিব ফিরোজ শাহ। ওয়াসার আগে তিনি খুলনার অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার ও ভারপ্রাপ্ত বিভাগীয় কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময় তার বিরুদ্ধে ঘুষের বিনিময়ে বদলী, জমির মামলায় ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে চলতি বছরের ৮ জানুয়ারি তাকে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে যুগ্মসচিব হিসেবে বদলী করা হয়েছিল।

সাধারণত প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের লক্ষ্য থাকে মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন শেষে সচিবালয়ে বদলী হওয়া। কিন্তু ওয়াসার দায়িত্ব নিতে তিনি মন্ত্রণালয় থেকে বদলী হয়ে খুলনা চলে আসেন। এরপর থেকেই প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব নিতে তৎপরতা শুরু করেন। কিন্তু শুরুতেই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের কাজ ননটেকনিক্যাল ব্যক্তিতে দিতে চায়নি মন্ত্রণালয়। এনিয়ে দেনদরবার চলা অবস্থায় গত ২৮ জুন অ্যাব খুলনা জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপপ্রধান প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম জুয়েলকে খুলনা ওয়াসার উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) পদে প্রেষণে নিয়োগ দেওয়া হয়। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়েল কোনো কর্মকর্তাকে অন্য সংস্থায় প্রেষণে পাঠানোর ঘটনা ছিল এটাই প্রথম। তিনি প্রকল্পটির পরিচালক হতে নানা তৎপরতা চালান। 

শেষ পর্যন্ত তদবির ও ঘুষ দিয়ে সবাইকে পেছনে পেলে প্রকল্প পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের চিঠি নিয়ে আসেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফিরোজ শাহ। গত ২৯ জুলাই তাকে প্রকল্প পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব পাওয়ার পর রেজাকে প্রকল্পের প্রকৌশলগত কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর তারা দু’জন ঠিকাদারি কাজ ভাগবাটোয়ারায় মনোযোগ দেন। 

সূত্রটি জানায়, পূর্বের মতো সংবাদ প্রকাশ হলে নিয়োগ ও প্রকল্পের দায়িত্ব ভেস্তে যেতে পারে-এমন আশংকায় সাংবাদিকদের ‘ম্যানেজ’ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নেতিবাচক প্রতিবেদন ঠেকানো এবং মাঠ পর্যায়ের কাজ করতে গেলে রাজনৈতিক নেতাদের সহযোগিতা লাগবে-এটা ঠিকাদারকে বোঝানোর পর সম্প্রতি তারা ২০ লাখ টাকা দেন। এ ব্যাপারে জানতে ওয়াসার ব্যবস্থাপনা ফিরোজ শাহকে ফোন করা হলে তিনি বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলা নিষেধ। কোনো তথ্য লাগলে আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট শাখার আবেদন করবেন। তবে, অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি ফোন কেটে দেন। নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউল ইসলাম বলেন, ‘আমি ছোট কর্মচারী। এসব বিষয়ে স্যারেরা ভালো জানেন। তার সঙ্গে কথা বলেন। না হলে অফিস টাইমের পরে নিরিবিল এক সময় আসেন, আমি কথা বলিয়ে দেব।’

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে