প্রশাসনের উচ্চপদে পদোন্নতির পরিবর্তে বাড়ছে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রবণতা

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ১৩ আগস্ট, ২০২৬, ০৯:২৫ এএম
প্রশাসনের উচ্চপদে পদোন্নতির পরিবর্তে বাড়ছে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রবণতা

প্রশাসনের উচ্চপদে পদোন্নতির পরিবর্তে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রবণতা বাড়ছে। ওসব পদে বিগত সরকারের আমলে অবসরপ্রাপ্ত আমলাদের বসানো হলেও এবার রাজনীতিকরাই ওই জায়গা নিচ্ছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকা নিয়মিত কর্মকর্তাদের মধ্যে নতুন করে বাড়ছে চরম হতাশা ও ক্ষোভ। বর্তমান সরকার সম্প্রতি ১২টি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষপদে এক বছরের জন্য নতুন নিয়োগ দিয়েছে। তারমধ্যে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদ ছাড়া বাকি ১১ পদই গ্রেড-২ মর্যাদার। মূলত সরকারি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা, বোর্ড ও করপোরেশনের শীর্ষ পদে নতুন করে সরকারদলীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, প্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বিগত কয়েক বছর ধরেই বেড়েছে গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর, সংস্থা, বোর্ড ও করপোরেশনের শীর্ষ পদে নিয়মিত পদোন্নতির পরিবর্তে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রবণতা। তাতে নিজেদের বঞ্চিত মনে করছেন দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকা কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ। তাদের মতে, প্রশাসনের ক্যারিয়ার কাঠামোয় যে ধারাবাহিকতা থাকার কথা, তা ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের কারণে দীর্ঘদিন ধরে মাঠ প্রশাসন, সচিবালয় ও বিভিন্ন অধিদপ্তরে দায়িত্ব পালন করেও অনেক কর্মকর্তাই উচ্চপদে পদোন্নতির সুযোগ বঞ্চিত হচ্ছেন। তাছাড়া অনেক কর্মকর্তার অতীতে রাজনৈতিক বিবেচনায় পদোন্নতি বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

সূত্র জানায়, অতিসম্প্রতি সরকারি এক আদেশে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক, বোয়েসেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি), বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান, বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান, জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের নির্বাহী সচিব, বিএসইসির চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান, বিসিকের চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ জুট করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে গ্রেড-২ পদমর্যাদায় এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। নিয়োগপ্রাপ্তদের সবাই ক্ষমতাসীন দল বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছে।

সূত্র আরো জানায়, প্রশাসনের উচ্চপদগুলোতে দীর্ঘদিন আমলারা বসলেও বর্তমান সরকার ওসব পদে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বসানো সঠিক ভাবছেন। মূলত এসব নিয়োগের জন্য আমলারাই দায়ী। কারণ আমলারা একে অপরের বিরুদ্ধে নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উত্থাপন করে। একজন আরেকজনকে দলীয় তকমা লাগায়। একে অপরের বিরুদ্ধে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ আনেন। এমন অবস্থায় সরকারের পক্ষে দলনিরপেক্ষ আমলা পাওয়া কঠিন হওয়ায় রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্তদের বসানোই সবচেয়ে নিরাপদ।

এদিকে জনপ্রশাসন সংশ্লিষ্টদের মতে, সচিব বা মহাপরিচালক- সব পদেই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিরুৎসাহিত করা প্রয়োজন। কারণ সার্ভিসের বাইরের লোক কখনই ওসব প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারবে না। সরকারের উচিত দলনিরপেক্ষ ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে ওসব পদে বসানো। দলনিরপেক্ষ কর্তকর্তারা কখনই সরকারের পা চাটবে না। প্রশাসনের উচ্চপদে তেমন লোক নিয়োগ করতে পারলে প্রশাসনের চেহারা রাতারাতি পালটে যাবে। আর দলীয় লোক নিয়োগের ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একটি ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা হলো মেধা, অভিজ্ঞতা ও জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পদোন্নতি। যখন গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো নিয়মিত পদোন্নতির পরিবর্তে চুক্তিভিত্তিক পূরণ করা হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। যারা ২৫ থেকে ৩০ বছর চাকরি করেছেন, অবসরের আগে তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের নেতৃত্ব দেয়ার সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। কিন্তু ওই সুযোগ যদি বারবার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে হাতছাড়া হয় তাহলে পুরো ক্যারিয়ার পরিকল্পনাই প্রশ্নের মুখে পড়ে। প্রশাসনের দক্ষতা শুধু একজন ব্যক্তির যোগ্যতার ওপর নির্ভর করে না, এটি একটি সুসংগঠিত ক্যারিয়ার কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। সেই কাঠামো দুর্বল হলে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে প্রশাসনের পেশাদারিত্ব।

অন্যদিকে এ বিষয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আবদুল বারী জানান, সরকার প্রশাসনকে একটি প্রমিত কাঠোমোতে দাঁড় করতে চায়। প্রশাসন থেকে বিশৃঙ্খলা উচ্ছেদ করতে চায়। সবকিছু স্বাভাবিক হতে একটু সময় লাগবে। সরকার জনকল্যাণে কাজ করছে। সংকীর্ণভাবে বিচার করলে হবে না।