অপরিকল্পিতভাবে আর নতুন বিশ্ববিদ্যালয় নয়: অর্থমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশ: ২১ আগস্ট, ২০২৬, ০৩:০৭ পিএম
অপরিকল্পিতভাবে আর নতুন বিশ্ববিদ্যালয় নয়: অর্থমন্ত্রী
ছবি: সংগৃহীত

নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষের অর্থনীতি ও চাহিদা বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা উচিত নয়। একই সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থাকে চাকরির বাজারের সঙ্গে সমন্বয়, গবেষণার পরিবেশ তৈরি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মানোন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।

শুক্রবার (২১ আগস্ট) সাভারের বিরুলিয়ার খাগান এলাকায় ব্র্যাক সিডিএমে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) উদ্যোগে উপাচার্যদের সঙ্গে দুই দিনব্যাপী জাতীয় পর্যায়ের নীতিনির্ধারণী সংলাপে এসব কথা বলেন অর্থমন্ত্রী।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে সেখানে কারা শিক্ষক হবেন, কারা পড়বেন এবং কোন বিষয়গুলোতে গবেষণা বা পাঠদানে গুরুত্ব দেওয়া হবে, তা ঠিক করা প্রয়োজন। তাঁর ভাষায়, ‘সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা উচিত না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগেই শিক্ষক কারা হবেন, কারা পড়বেন, কোন বিষয়ে গবেষণা বা পাঠদানে ফোকাস দেওয়া হবে এসব বিষয় ঠিক করা প্রয়োজন। না হলে তা প্রকৃত অর্থে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে ওঠে না।’

তিনি বলেন, নতুন কোনো বিশ্ববিদ্যালয় চালু করতে হলে প্রয়োজনীয় সবকিছু গুছিয়ে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা উচিত। এক বা দুটি বিষয় কিংবা অনুষদ খুলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা ও পাঠদানের মানোন্নয়নে বেশি মনোযোগ দেওয়া দরকার।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘নতুন কোনো বিশ্ববিদ্যালয় চালু করতে হলে হয় সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে পুরোদমে চালু করতে হবে। কেবল একটি দুটি বিষয় বা অনুষদ খুলে আর কোনো বিশ্ববিদ্যালয় চালু করা উচিত হবে না, বরং বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা ও পাঠদানের মানোন্নয়নে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।’

শিক্ষাব্যবস্থাকে বাস্তব জীবনের প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দেন আমির খসরু। তিনি বলেন, ‘আমরা সত্যিকার অর্থে রিয়েল লাইফ এডুকেশনে যেতে চাচ্ছি।’ দেশের ভেতরে ও বাইরে প্রয়োজনভিত্তিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা দরকার বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তাঁর মতে, শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা শেষ করে যাতে ক্রেডিট ট্রান্সফারের সুযোগ পায়, সে জন্য মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। এমন শিক্ষাব্যবস্থা দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতেও সহায়তা করবে।

অর্থমন্ত্রী জানান, শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে চাকরির বাজারের সমন্বয় করে পুরো ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৫ শতাংশ ধরে সরকার কাজ করছে। অর্থনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষা খাতেও জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেটিংয়ের বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন আমির খসরু। তিনি বলেন, শুধু গবেষণার পরিমাণ নয়, বিশ্ববিদ্যালয় কীভাবে এবং কোথায় অর্থ ব্যয় করছে, সেটিও রেটিংয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিষয় যথাযথভাবে তুলে ধরলে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেটিং বাড়াতে সহায়তা করবে।

উচ্চশিক্ষার মান মূল্যায়নে রেটিংয়ের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে অর্থমন্ত্রী বলেন, কোনো দেশের অর্থনৈতিক রেটিং কমে গেলে যেমন বিশ্বব্যাপী নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, তেমনি শিক্ষার রেটিং কমলেও দেশের ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

তিনি বলেন, ‘ইন্ডাস্ট্রি-অ্যাকাডেমি সম্পর্ক কাজে লাগাতে পারিনি আমরা, কিন্তু এখন এটা করতে হবে। ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতিতে প্রবেশ করতে হলে এর কোনো বিকল্প নেই।’

চাকরির বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষাব্যবস্থা হালনাগাদ করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। গবেষণাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়ে আমির খসরু বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

এ সময় শিক্ষা খাতে সরকারের অবস্থান তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিএনপি সরকার শিক্ষা খাতে সবচেয়ে বড় বাজেট বাস্তবায়ন করেছে।

দুই দিনব্যাপী জাতীয় পর্যায়ের এই নীতিনির্ধারণী সংলাপে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬০ জন উপাচার্যসহ নীতিনির্ধারক, জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা, দেশি-বিদেশি শিক্ষাবিদ, বিশেষজ্ঞ এবং ইউজিসি ও হায়ার এডুকেশন এক্সিলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট) প্রকল্পের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

সংলাপে উচ্চশিক্ষা খাতের বর্তমান বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়েও আলোচনা হয়। প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশ, শ্রমবাজারের পরিবর্তিত চাহিদা, শিক্ষার গুণগত মান ও জবাবদিহির প্রত্যাশা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মতো বিষয়গুলো সামনে রেখে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আরও উদ্ভাবনী, জবাবদিহিমূলক ও সুশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মাহ্দী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনা অনুসারে মানুষের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাতে চায় সরকার। শিক্ষার মাধ্যমে শুধু সনদ অর্জন নয়, শিক্ষার্থীদের মধ্যে সুনাগরিকের গুণাবলি তৈরি এবং কর্মদক্ষতা নিশ্চিত করাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, ন্যায্যতা, সমতা ও সুশাসনভিত্তিক সমাজব্যবস্থা নিশ্চিত করতে শিক্ষার্থীদের এসব গুণ অর্জন জরুরি। একই সঙ্গে দেশের কারিকুলাম আধুনিকায়নে ঘাটতি রয়েছে উল্লেখ করে সেটিকে আরও বাস্তবসম্মত করার উদ্যোগের কথা জানান তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন শর্টকোর্স চালুর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কর্মদক্ষতা বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে ভাবা হচ্ছে বলে জানান শিক্ষা উপদেষ্টা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে ইনোভেশন হাব গড়ে তোলা এবং স্থানীয় পর্যায়ের প্রয়োজন অনুযায়ী গবেষণার ইকোসিস্টেম তৈরির আহ্বানও জানান তিনি। পাশাপাশি প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তৃতীয় ভাষার কোর্স চালুর ওপর গুরুত্ব দেন ড. মাহ্দী আমিন।

ইউজিসি চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মামুন আহমেদ বলেন, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কর্মদক্ষ সুনাগরিক গড়ে তোলার কেন্দ্রে পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তিনি জানান, আগামী বছরের শুরুতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রথম সারির অন্তত ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে তৃতীয় ভাষা চালুর প্রচেষ্টা চলছে। যে এলাকার মানুষের নির্দিষ্ট কোনো দেশে যাওয়ার প্রবণতা বেশি, সেই এলাকার প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ভাষা শেখানোর বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সংলাপের প্রথম দিনে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যরা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন সমস্যা ও উচ্চশিক্ষা খাতের নানা বিষয় তুলে ধরেন।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে