রাজধানীর যোগাযোগ ব্যবস্থা

পরিবর্তন আনা সময়ের দাবি

এফএনএস | প্রকাশ: ২১ আগস্ট, ২০২৬, ০৭:৪৫ পিএম
পরিবর্তন আনা সময়ের দাবি

রাজধানী ঢাকার মতো একটি মেগাসিটিতে গণপরিবহণে শৃঙ্খলা থাকা শুধু নাগরিক সুবিধার প্রশ্ন নয়, বরং অর্থনৈতিক গতিশীলতা, পরিবেশের ভারসাম্য এবং মানুষের নিরাপদ জীবনযাত্রার জন্য অপরিহার্য। প্রতিদিন কোটি মানুষের যাতায়াতের চাপ সামলাতে হলে একটি কার্যকর, নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য গণপরিবহণব্যবস্থা থাকা জরুরি। সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছানো, উৎপাদনশীলতা বজায় রাখা এবং নগরবাসীর মানসিক স্বস্তিসহ সবকিছুই নির্ভর করে সুষ্ঠু পরিবহণ ব্যবস্থার ওপর। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ঢাকার গণপরিবহণে দীর্ঘদিন ধরেই ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য বিরাজ করছে। সড়কে প্রতিনিয়ত অনিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা, ওভারটেকিং, ঝুঁকিপূর্ণভাবে যাত্রী তোলা এবং তীব্র যানজট নগরবাসীর মূল্যবান সময় ও শ্রম নষ্ট করছে। শুধু তাই নয়, এ বিশৃঙ্খলা প্রতিদিন কেড়ে নিচ্ছে বহু প্রাণ, শত শত মানুষ পঙ্গুত্ববরণ করে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। ঢাকা পরিবহণ সমন্বয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় চার কোটি ট্রিপ হলেও বাসে যাত্রী পরিবহণের হার ২০০৯ সালের ২৮ শতাংশ থেকে কমে বর্তমানে মাত্র ৭ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সময়ে প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষকে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছাতে হচ্ছে। এ পরিসংখ্যান কেবল হতাশাজনক নয়, বরং প্রশাসনিক ব্যর্থতার স্পষ্ট প্রমাণ। গণপরিবহণের এ অচলাবস্থার মূল কারণ কারিগরি জটিলতা নয়, বরং সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনার অভাব এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি। বাস রুট রেশনালাইজেশন বা কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনা কোনো জটিল প্রযুক্তিগত বিষয় নয়, এটি মূলত একটি নিয়মানুগ প্রশাসনিক ব্যবস্থা। কিন্তু মালিকদের দৈনিক চুক্তিভিত্তিক টাকা আদায়ের প্রথা চালু থাকায় চালকরা আয়ের তাগিদে সড়কে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন। এতে যাত্রী নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয় এবং সড়কে বিশৃঙ্খলা আরও বাড়ে। বিগত এক দশকে বাস রুট রেশনালাইজেশন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলেও তা বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। অতীতে ১৭৪টি রুটকে ২২টিতে আনা, খুচরা কোম্পানিকে ছয়টি ফ্র্যাঞ্চাইজিতে যুক্ত করা এবং আধুনিক বাস চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব ও পরিবহণ গোষ্ঠীর অসহযোগিতার কারণে সেই রূপরেখা থমকে যায়। বিচ্ছিন্ন বা পরীক্ষামূলক পদক্ষেপে সমাধান আসবে না; সমগ্র রাজধানীতে একযোগে রুট রেশনালাইজেশন চালু করতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত গণপরিবহণে টেকসই শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। বাস রুট রেশনালাইজেশন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে, চালকদের নির্দিষ্ট বেতন ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে এবং সড়কে চাঁদাবাজি পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। বুয়েট ও নগর পরিকল্পনাবিদদের সমন্বয়ে একটি জবাবদিহিমূলক রোডম্যাপ প্রণয়ন জরুরি। আমরা মনে করি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন বা মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন যেমন জরুরি, তেমনই বাসের মতো মৌলিক গণপরিবহণকে শৃঙ্খলায় আনা সমান গুরুত্বপূর্ণ।