কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ অঞ্চলে অপহরণ, মুক্তিপণ এবং সশস্ত্র সহিংসতার ধারাবাহিক ঘটনা গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে অন্তত ৩২০ জন অপহরণের শিকার হয়েছেন। একই সঙ্গে নিরাপত্তাহীনতার কারণে শতাধিক পরিবার নিজেদের বসতভিটা ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। কোনো জনপদে মানুষ যখন নিজের ঘরে নিরাপদ বোধ করে না, তখন তা শুধু আইনশৃঙ্খলার সংকট নয়; বরং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, পাহাড়ঘেঁষা এলাকায় অপহরণ, মুক্তিপণের দাবি এবং রাতের গোলাগুলির ঘটনায় সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। শিশু, নারী, ব্যবসায়ী কিংবা সাধারণ শ্রমজীবী-কেউই যেন এই আতঙ্কের বাইরে নেই। ভুক্তভোগীদের অনেকেই মুক্তিপণ দিয়ে ফিরে এলেও তাঁদের মানসিক ও সামাজিক ক্ষতির কোনো সহজ প্রতিকার নেই। পাশাপাশি আতঙ্কে মানুষ এলাকা ছাড়ায় স্থানীয় অর্থনীতি, শিক্ষা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় সশস্ত্র ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার কথা এলেও, এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর বক্তব্যও পাওয়া যায়নি। তাই তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কোনো পক্ষকে দায়ী করা সমীচীন হবে না। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট-অপরাধী যে-ই হোক, তাদের বিরুদ্ধে আইনের নিরপেক্ষ ও কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। ইতোমধ্যে বিশেষ আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় পুলিশ চৌকি স্থাপন, যৌথ অভিযান এবং টহল জোরদারের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে দুর্গম এলাকায় দ্রুত পৌঁছানোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ জোরদার এবং স্থানীয় জনগণের সঙ্গে আস্থাভিত্তিক সমন্বয় গড়ে তোলাও প্রয়োজন। উখিয়া-টেকনাফ সীমান্তবর্তী ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। তাই এখানে আইনশৃঙ্খলার অবনতি শুধু স্থানীয় সমস্যা নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও সম্পর্কিত। অপরাধ দমনে সাময়িক অভিযান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত কৌশল, যাতে অপহরণ ও সহিংসতার মূল উৎস চিহ্নিত করে তা স্থায়ীভাবে নির্মূল করা যায়। মানুষের ঘরে ফেরার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন প্রশাসনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।