নেপালে ভয়াবহ বন্যা-ভূমিধস, নিহত ১৬৫, নিখোঁজ ৮২৬

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
| আপডেট: ২৭ আগস্ট, ২০২৬, ১২:২০ পিএম | প্রকাশ: ২৭ আগস্ট, ২০২৬, ১২:০৩ পিএম
নেপালে ভয়াবহ বন্যা-ভূমিধস, নিহত ১৬৫, নিখোঁজ ৮২৬

নেপালে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৬৫ জনে দাঁড়িয়েছে। একই ঘটনায় এখনো ৮২৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে নিরাপত্তাকর্মী, পর্যটক ও সাধারণ মানুষ রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৫২৯ জনের বেশি পর্যটক বলে জানিয়েছে দেশটির জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ নেপালের ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটি (এনডিআরআরএমএ)।

বুধবার হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ ধস ও ধ্বংসাবশেষের প্রবাহের পর নেপাল-চীন সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ বন্যা ও কাদামাটির স্রোত নেমে আসে। এতে জনপদ, সড়ক, সেতু ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পসহ বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকায় এখনো উদ্ধার অভিযান চলছে।

নেপালের ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটি (এনডিআরআরএমএ)-এর সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বন্যাকবলিত এলাকা থেকে ১৬৫টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। মরদেহগুলোর পরিচয় শনাক্তের কাজ চলছে। সংস্থাটি জেলা প্রশাসন কার্যালয় ও জরুরি কার্যক্রম কেন্দ্রগুলোর তথ্যের ভিত্তিতে এই হিসাব দিয়েছে। একই সঙ্গে ৮৫ জন জরুরি সেবা কর্মীর সঙ্গে এখনো যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি বলে জানানো হয়েছে।

এর আগে নেপাল পুলিশের হিসাবে নিহতের সংখ্যা ছিল ১৬২ জন। পুলিশের ওই হিসাব অনুযায়ী, চিতওয়ান জেলায় ৬৪টি এবং নাওয়ালপরাসি ইস্টে ২৬টি মরদেহ পাওয়া যায়। ২৮ জন পুলিশ সদস্যও নিখোঁজ ছিলেন।

দুর্যোগে নিখোঁজ পর্যটকের সংখ্যা ৫২৯ জনের বেশি। তাদের অনেকেই মাউন্ট কৈলাশ ও মানসসরোবরের উদ্দেশে বা সেখান থেকে ফেরার পথে ছিলেন।

একটি পর্যটন প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, তাদের ১৫ দিনের তীর্থযাত্রায় থাকা ২৭ জন পর্যটক ও চারজন কর্মীর সঙ্গে বুধবার সকাল ৮টার পর আর যোগাযোগ করা যায়নি। নিখোঁজদের তালিকায় ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, কানাডা, মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিক রয়েছেন।

আরেকটি পর্যটন প্রতিষ্ঠানের ৪৭ সদস্যের একটি দলও নিখোঁজ রয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ওই দলে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নেপাল, যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর ও যুক্তরাজ্যের নাগরিক ছিলেন। তাদের মধ্যে নেপালের সাতজন গাইড ছিলেন।

ভারতের অন্তত ১৩৩ জন নাগরিকও নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের অনেকেই হিন্দুদের পবিত্র তীর্থস্থান মাউন্ট কৈলাশে যাওয়ার পথে ছিলেন। করোনাভাইরাস মহামারি এবং পরবর্তী সময়ে ভারত-চীন উত্তেজনার কারণে কিছু সময় বন্ধ থাকার পর সম্প্রতি কৈলাশ-মানসসরোবর তীর্থযাত্রা আবার শুরু হয়েছিল।

চীনের তিব্বত অংশেও বন্যা ও ভূমিধসের ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তিব্বতের গ্যিরং কাউন্টিতে কাদামাটির ধসের ঘটনায় ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক। সেখানে এখন পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

গ্যিরং সীমান্ত চীন ও নেপালের মধ্যে পর্যটক ও পণ্য চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ পথ। ওই এলাকায় কাদার স্তর প্রায় দেড় মিটার গভীর এবং ধসের বিস্তৃতি সীমান্ত চৌকি থেকে প্রায় ২ দশমিক ৫ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছেছে।

তবে নেপাল ও তিব্বতের নিখোঁজের বিভিন্ন হিসাবের মধ্যে একই ব্যক্তির নাম একাধিকবার গণনা হয়েছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, ঘটনাটি ভূমিকম্প ছিল না। সংস্থাটি পরে বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হয়েছে, হিমবাহ ধস ও ধ্বংসাবশেষের প্রবাহই এই বিপর্যয়ের সূত্রপাত ঘটায়।

এর আগে বুধবার ঘটনাটিকে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছিল। পরে আশপাশের ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য, দীর্ঘ তরঙ্গের কম্পন এবং স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে সেই তথ্য সংশোধন করা হয়।

নেপালের কর্তৃপক্ষও এর আগে জানিয়েছিল, পাহাড়ের একটি বিশাল বরফের অংশ ধসে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাথর ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ নিচে নেমে এসে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি করতে পারে।

আন্তর্জাতিক পর্বত উন্নয়ন সংস্থা (ইসিমোড)-এর এক মূল্যায়নে আরও একটি সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে। নদীতে নেমে আসা ধ্বংসাবশেষের কারণে ত্রিশূলী নদীর সরু কোনো অংশ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেলে সেখানে ভূমিধসজনিত বাঁধ তৈরি হতে পারে। এতে পরবর্তী সময়ে আরেকটি আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। কর্তৃপক্ষ ও বিজ্ঞানীরা সম্ভাব্য এমন বাধার আকার, অবস্থান ও স্থিতিশীলতা যাচাই করছেন।

নেপালি সেনাবাহিনী বন্যাকবলিত এলাকায় স্থল ও আকাশপথে উদ্ধার অভিযান চালাতে ২ হাজার সেনা মোতায়েন করেছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত রাসুয়া ও নুওয়াকোট জেলায় তাদের বড় অংশ কাজ করছে।

সেনাবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৯৭ জনকে বন্যাকবলিত এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। রাসুয়ার তিমুরে এলাকা থেকে ৯৫ জনকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২১ জন ভারতীয় পর্যটকও রয়েছেন, যারা বুধবার তিমুরে এলাকা থেকে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন।

একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে আটকে পড়া সাতজনকেও জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। তবে আরও তিনটি টানেলে আটকে থাকা ব্যক্তিদের উদ্ধারে অভিযান চলছে।

নেপালের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সেনাবাহিনী ও বেসরকারি হেলিকপ্টারের মাধ্যমে আকাশপথে মোট ১১৪ জনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সেনাবাহিনী ৮৫ জনকে উদ্ধার করেছে।

সেনাবাহিনীর উদ্ধার করা ব্যক্তিদের মধ্যে তিমুরে থেকে ধুনছে ৬০ জন, তিমুরে থেকে ত্রিশূলী ১৩ জন, মাইলুং থেকে পাঁচজন, বেত্রাবতী থেকে চারজন এবং ত্রিশূলী থেকে তিনজনকে কাঠমান্ডুতে নেওয়া হয়েছে।

বেসরকারি হেলিকপ্টার পরিচালনাকারীরা আরও ২৯ জনকে উদ্ধার করেছে। কৈলাশ হেলিকপ্টার, প্রভু হেলিকপ্টার ও ফিশটেইল এয়ার পাঁচজন করে আহতকে মহারাজগঞ্জের টিইউ টিচিং হাসপাতালে নিয়ে যায়। সিমরিক এয়ার দুই দফায় তিনজন ও দুইজনকে উদ্ধার করে। অন্নপূর্ণা হেলিকপ্টার চারজন, এভারেস্ট এয়ার দুজন এবং প্রভু হেলিকপ্টারের আরেকটি ফ্লাইট দুজনকে বীর হাসপাতালে নিয়ে যায়।

দুর্যোগে আহত ৪১ জন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর মধ্যে মহারাজগঞ্জের টিইউ টিচিং হাসপাতালে ২০ জন, ত্রিশূলী হাসপাতালে নয়জন, ট্রমা সেন্টারে চারজন, বীর হাসপাতাল ও নরভিক হাসপাতালে তিনজন করে এবং ছাউনির বীরেন্দ্র মিলিটারি হাসপাতালে একজন চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

বন্যায় অবকাঠামোরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অন্তত ১৯টি যান চলাচলযোগ্য সেতু ধ্বংস হয়েছে এবং প্রায় ৪০ কিলোমিটার পাকা মহাসড়ক চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এতে যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি দুর্গম এলাকায় উদ্ধারকাজও কঠিন হয়ে পড়েছে।

নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল জানিয়েছেন, তিমুরে, স্যাফ্রুবেশি, বেত্রাবতী, ত্রিশূলী বাজার ও দেবীঘাট এলাকায় চরম ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য প্রাথমিক।

নুওয়াকোট, ধাদিং, গোরখা ও চিতওয়ান জেলার ভোটেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী এলাকায় উচ্চ ঝুঁকি থাকায় সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত রাসুয়ার গালছি-নুওয়াকোট ও স্যাফ্রুবেশি সড়ক এবং মুগলিং-নারায়ণগড় সড়ক এড়িয়ে চলার জন্য জনসাধারণকে অনুরোধ করেছে কর্তৃপক্ষ।

ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোকে তিন মাসের জন্য দুর্যোগকবলিত অঞ্চল ঘোষণা করেছে নেপাল সরকার। আহতদের বিনামূল্যে চিকিৎসা, বাস্তুচ্যুতদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া এবং সেনাবাহিনী ও বেসরকারি হেলিকপ্টারের মাধ্যমে উদ্ধার অভিযান চালানো হচ্ছে।

নেপালের ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটি (এনডিআরআরএমএ) হেলিকপ্টার ও ড্রোন পরিচালনাকারীদের জেলা প্রশাসন, নিরাপত্তা সংস্থা ও স্থানীয় সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে উদ্ধার অভিযান চালানোর আহ্বান জানিয়েছে। আটকে পড়া বাসিন্দাদের নিজেদের অবস্থান জানানোর জন্য আগুন জ্বালিয়ে ধোঁয়ার সংকেত দেওয়ার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।

ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর নেপালকে সহায়তায় এগিয়ে এসেছে ভারত, চীন ও বিশ্বব্যাংক।

নেপালের অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলের সঙ্গে কথা বলে বিশ্বব্যাংকের নেপাল কান্ট্রি ডিরেক্টর ডেভিড সিসলেন জানিয়েছেন, বিভিন্ন উৎস থেকে জরুরি সহায়তা হিসেবে সর্বোচ্চ ২৫ বিলিয়ন নেপালি রুপি সংগ্রহ করা সম্ভব হতে পারে।

ভারত জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রীর তালিকা চেয়েছে। কাঠমান্ডুতে ভারতীয় ত্রাণসামগ্রী পৌঁছানোর বিষয়টি সমন্বয় করছেন নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল।

চীনও তাৎক্ষণিক নগদ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। নেপালে অর্থ স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করতে দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নেপালের অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে আন্তর্জাতিক সহায়তা গ্রহণ ও তা যথাযথভাবে ব্যবহারের প্রক্রিয়া পরিচালনা করছেন।

তথ্য সূত্র: বিবিসি, আল-জাজিরা