সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় বেতন স্কেল অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। নতুন কাঠামোতে ২০তম গ্রেডের সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডের সর্বোচ্চ মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন বেতন কাঠামো ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে কার্যকর হবে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ কক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ অনুমোদন দেওয়া হয়। বৈঠকে উপস্থিত সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। পরে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়।
নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রথম ধাপে ১ জুলাই থেকে মূল বেতনের ৩০ শতাংশ কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে আরও ৩৫ শতাংশ কার্যকর করা হবে। অবশিষ্ট অংশ পরবর্তী অর্থবছরের জুলাইয়ে এবং এরপর একই অর্থবছরের জানুয়ারিতে ভাতাগুলো বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হতে পারে।
নতুন বেতন কাঠামোয় প্রথমবারের মতো প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা চালুর সিদ্ধান্তও রয়েছে। এ ভাতার আওতায় মাসে ৩ হাজার টাকা দেওয়া হবে।
নতুন পে-স্কেলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য ‘যৌথবাহিনী নির্দেশাবলী-২০২৬’ অনুমোদন করা হয়েছে। এটিও ১ জুলাই থেকে কার্যকর হবে। তবে জুডিশিয়াল সার্ভিসের জন্য পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জুডিশিয়াল সার্ভিস বেতন স্কেল অনুমোদন করা হবে। জাতীয় বেতন স্কেলের মতো এটিও ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে কার্যকর করার কথা রয়েছে।
নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য অর্থের সংস্থান নিয়ে আগে থেকেই আলোচনা ছিল। সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দ্য ডেইলি স্টারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, বিপুল পরিমাণ আমদানির কারণে রাজস্বের সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়েছে। এ কারণে সরকার ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রথম থেকে ২০তম গ্রেডের সরকারি কর্মচারীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছিল।
নতুন পে-স্কেলের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ প্রক্রিয়া। অষ্টম জাতীয় বেতন কমিশন গঠনের প্রায় এক যুগ পর ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই ২৩ সদস্যের নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করা হয়। সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে গঠিত কমিশন চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়।
নবম বেতন কমিশন বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল। কমিশনের প্রস্তাবে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার কথা বলা হয়েছিল। পরে মন্ত্রিসভার অনুমোদিত কাঠামোয় সর্বোচ্চ মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
কমিশনের হিসাবে, দেশে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগী রয়েছেন। তাঁদের পেছনে বর্তমানে বছরে প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে।
এই বিপুল অর্থের সংস্থান সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতার জন্য ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। গত অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দের তুলনায় এ বরাদ্দ ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বেশি।
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সুপারিশ চূড়ান্ত করতে ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে সভাপতি করে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা করে নতুন বেতন কাঠামোর খসড়া চূড়ান্ত করার দায়িত্ব ছিল এই কমিটির ওপর।
এর আগে ১১ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনের সময় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছিলেন, ১ জুলাই থেকে নতুন বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। তিনি বলেছিলেন, প্রায় ১১ বছর ধরে সরকারি কর্মচারীরা একই বেতন কাঠামোয় বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। এ সময়ে মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।