বাংলাদেশের ওষুধশিল্প আজ বৈশ্বিক বাজারে সাফল্যের গল্প লিখছে। দেশীয় উৎপাদকরা স্থানীয় চাহিদার প্রায় শতভাগ পূরণ করছেন, বিশ্বের ১৩২টি দেশে ওষুধ রপ্তানি করছেন। অথচ একই সময়ে দেশের ভেতরে জীবন রক্ষাকারী অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের মারাত্মক সংকট দেখা দিয়েছে। এই বৈপরীত্যই আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার গভীর অসংগতি প্রকাশ করে। খবরে জানা গেছে, ১৯৯৪ সালের তালিকায় থাকা ১১৭টি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের মধ্যে বর্তমানে বাজারে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৬০টি। বাকি ৫৭টি ওষুধের সরবরাহ বন্ধ। এর মধ্যে রয়েছে ম্যালেরিয়া ও যক্ষ্ণার চিকিৎসায় অপরিহার্য ওষুধ, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ওষুধ, একাধিক অ্যান্টিবায়োটিক, প্রসবকালীন জরুরি ওষুধ এবং সাপের কামড়ের অ্যান্টিভেনম। এমনকি হাম, পোলিও, ডিপথেরিয়া ও ইয়েলো ফিভারের মতো টিকাও বাজারে অনুপস্থিত। নিম্ন আয়ের মানুষ ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত রোগীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এ সংকটের মূল কারণ নীতিগত ব্যর্থতা। আইন অনুযায়ী উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ৩০ শতাংশ অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ উৎপাদনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা কখনোই বাস্তবায়ন হয়নি। হাই-টেক ওষুধের বাহবা থাকলেও সাধারণ মানুষের প্রয়োজনীয় ওষুধ উৎপাদনে চরম অবহেলা দেখা যাচ্ছে। ঔষধ প্রশাসনের দুর্বল তদারকি ও জবাবদিহির অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রতি দুই বছর অন্তর অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদ করে। সর্বশেষ তালিকায় রয়েছে ৫২৩টি ওষুধ এবং শিশুদের জন্য পৃথকভাবে ৩৭৪টি। বিশ্বের ১৫০টির বেশি দেশ এই তালিকা অনুসরণ করে জাতীয় তালিকা তৈরি করে। অথচ বাংলাদেশে গত তিন দশকে তালিকা হালনাগাদ হয়নি। ২০০৮ সালে ২০৯টি ওষুধ নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় তালিকা প্রকাশ করা হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। রোগ ও চিকিৎসার ধরন পরিবর্তন হলেও তালিকা অপরিবর্তিত থেকে গেছে। আমরা মনে করি, এখনই সময় অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ তালিকা হালনাগাদ করার। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে ঔষধ প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। লোকবল বাড়াতে হবে, বাজারে ওষুধের সরবরাহ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং আইনানুগ বাধ্যবাধকতা কার্যকর করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, জীবন রক্ষাকারী ওষুধ নিয়ে কোনো ধরনের অপতৎপরতা বরদাশত করা যাবে না। উৎপাদন ও সরবরাহে অনিয়ম বা অবহেলা থাকলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। ওষুধশিল্পের সাফল্য তখনই অর্থবহ হবে, যখন সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় ওষুধ সহজে ও সাশ্রয়ী মূল্যে পাবে। অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সংকট শুধু স্বাস্থ্যসেবার ব্যর্থতা নয়, বরং মানবাধিকারের লঙ্ঘন। তাই এখনই সময় নীতিগত সংস্কার, কার্যকর নজরদারি এবং জনস্বার্থে সাহসী পদক্ষেপ নেওয়ার।