বর্ষা মৌসুমে শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন এলাকায় লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে বিভিন্ন প্রজাতির সাপসহ নানা বন্যপ্রাণী। গত ১ আগস্ট থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত এক মাসে শ্রীমঙ্গল উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ২০টি বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী উদ্ধার করেছে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন।
উদ্ধার করা প্রাণীগুলোর মধ্যে অজগর সাপের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। উদ্ধারের পর এসব বন্যপ্রাণী পরবর্তী ব্যবস্থাপনা ও নিরাপদে অবমুক্ত করার জন্য শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেঞ্জ কার্যালয়ে হস্তান্তর করা হয়েছে। বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল জানান, বর্ষাকালে অতিবৃষ্টির কারণে বনাঞ্চল, ঝোপঝাড়, নিচু এলাকা ও সাপের আবাসস্থলে পানি জমে যায়। এতে অনেক প্রাণী তাদের স্বাভাবিক আশ্রয়স্থল ছেড়ে অপেক্ষাকৃত শুকনো ও নিরাপদ জায়গার সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে। খাবারের সন্ধানেও সাপসহ বিভিন্ন প্রাণী লোকালয়ের কাছাকাছি চলে আসে। এ সময় মানুষের সঙ্গে তাদের মুখোমুখি হওয়ার ঘটনাও বেড়ে যায়।
তিনি বলেন, বিশেষ করে অজগর সাধারণত মানুষের ক্ষতি করতে লোকালয়ে আসে না। বৃষ্টি ও বন্যার পানিতে তাদের আশ্রয়স্থল ক্ষতিগ্রস্ত হলে কিংবা খাদ্যের সন্ধানে তারা বাড়িঘর, রাস্তার পাশ, বাগান ও অন্যান্য স্থানে চলে আসতে পারে। তাই সাপ দেখলেই আতঙ্কিত না হয়ে উদ্ধারকারী দল বা বন্যপ্রাণী বিভাগকে খবর দিলে প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারীদের মাধ্যমে প্রাণীটি উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে ছেড়ে দেওয়া সম্ভব।
বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী আগস্ট মাসে উদ্ধার করা ২০টি প্রাণীর মধ্যে রয়েছে-- ১০ টি অজগর সাপ, সাইবার্ড ওয়াটার স্নেক ১টি, বেত আঁচড়া সাপ ২টি, দাঁড়াশ সাপ ১টি, শঙ্খিনী সাপ ২ টি, উল্টোলেজি বানর ১টি, লজ্জাবতী বানর ১টি, তক্ষক ১টি, শঙ্খচিল ১টি। এ তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অজগর সাপই সবচেয়ে বেশি উদ্ধার হয়েছে। এর পাশাপাশি শঙ্খিনী, দাঁড়াশ, তক্ষকসহ অন্যান্য সাপ এবং শঙ্খচিল, লজ্জাবতী বানর ও উল্টো লেজি বানরও উদ্ধার করা হয়েছে।
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষায় সাপের চলাচল বেড়ে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি প্রাকৃতিক কারণ রয়েছে। অতিবৃষ্টিতে মাটির গর্ত, ঝোপঝাড় ও নিচু এলাকার আশ্রয়স্থল পানিতে তলিয়ে যায়। ফলে সাপ শুকনো জায়গার সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে। একই সঙ্গে বৃষ্টির সময় ব্যাঙ, ইঁদুর, মাছসহ বিভিন্ন ছোট প্রাণীর চলাচল বাড়ে। এসব প্রাণী সাপের খাদ্য হওয়ায় খাদ্যের সন্ধানেও সাপ মানুষের বসতবাড়ির কাছাকাছি চলে আসতে পারে।
শ্রীমঙ্গল যেহেতু বন, চা-বাগান, হাওর, পাহাড়ি এলাকা ও সবুজে ঘেরা, তাই এখানে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সহাবস্থান দীর্ঘদিনের। বনাঞ্চল ও প্রাকৃতিক আবাসস্থলের কাছাকাছি হবার কারণেও মাঝেমধ্যে বন্যপ্রাণী লোকালয়ে চলে আসে।
স্বপন দেব সজল বলেন, লোকালয়ে সাপ বা কোনো বন্যপ্রাণী দেখা গেলে আতঙ্কিত না হয়ে সেটিকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে সংশ্লিষ্ট উদ্ধারকারী দলকে খবর দেওয়া উচিত। এতে একদিকে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে মূল্যবান বন্যপ্রাণীও রক্ষা পাবে। তিনি আরও জানান, উদ্ধার করা প্রাণীগুলো যথাযথ প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে। পরবর্তীতে প্রাণীগুলোর অবস্থা ও প্রজাতি বিবেচনা করে উপযুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।