কালীগঞ্জসহ বিভিন্নস্থানে পৃথক গণপিটুনি,জুতারমালাসহ নানা ধরনের অপরাধের ঘটনা ঘটছে।ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে অষ্টম শ্রেনীতে পড়ুয়া এক স্কুলছাত্রীকে জোরপূর্বক মোটর সাইকেলে তুলে নিয়ে অপহরণের অভিযোগ উঠেছে। এ সময় মেয়েটিকে উদ্ধার করতে গেলে তার বাবাকে মারধর করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। ৩০ আগস্ট বিকালে কালীগঞ্জ থানায় এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ করেছেন কিশোরীর বাবা আব্দুল মান্নান তিনি উপজেলার সুন্দরপুর-দুর্গাপুর ইউনিয়নের ভাটপাড়া গ্রামের বাসিন্দা।অভিযোগে বলা হয়েছে, আব্দুল মান্নানের ১৩ বছর বয়সী মেয়ে মোছা. এনি স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেনির ছাত্রী।দীর্ঘদিন ধরে কালীগঞ্জ পৌর এলাকার খয়েরতলা গ্রামের হৃদয়(২৬)তাকে স্কুলে যাওয়াআসার পথে উত্ত্যক্ত ও হয়রানি করে আসছিলো বলে অভিযোগ করা হয়েছে।ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে মাদ্রাসার ছাত্রীদের সঙ্গে অশালীন অঙ্গভঙ্গি ও আচরণের অভিযোগে সুমন হোসেন (৩৩) নামে এক যুবককে আটক করে জুতার মালা পরিয়ে এলাকায় ঘোরানোর ঘটনা ঘটেছে।৩১ আগস্ট বেলা ১২ টার দিকে উপজেলার কাষ্টভাঙ্গা ইউনিয়নের কুমারহাটি মোহাম্মাদিয়া দাখিল মাদ্রাসা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।অভিযুক্ত সুমন হোসেন কাষ্টভাঙ্গাইউনিয়নের মথনপুর গ্রামের আলম হোসেনের ছেলে।তিনি পেশায় রাজমিস্ত্রি।বিষয়টি স্থানীয়দের নজরে এলে সোমবার তাকে মাদ্রাসা এলাকার কাছ থেকে আটক করা হয়।পরে স্থানীয়দের পাশাপাশি মাদ্রাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে তাকে জুতার মালা পরিয়ে এলাকায় ঘোরানো হয় বলে এক ভিডিওর মাধ্যমে জানা গেছে।ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে ফেসবুকে ব্যক্তিগত ছবি বিকৃত করে জুতার মালা পরানো এবং অশ্লীল ভাষায় অপপ্রচারের অভিযোগে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন ইউপি সদস্য মোঃ জসিম।তিনি কালীগঞ্জ উপজেলার রাখালগাছি ইউনিয়নের বহিরগাছি মধ্যপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। জিডি নম্বর ১৫৫৩।গত ২৯ আগস্ট বিকেল ৫টার দিকে তিনি নিজের ফেসবুক আইডিতে প্রবেশ করে দেখতে পান, তার নামে একটি ফেসবুক আইডি থেকে তার ব্যক্তিগত ছবি এডিট করে ছবিতে জুতার মালা পরানো হয়েছে।এ ছাড়া ওই আইডি থেকে তাকে সামাজিক ভাবে হেয়প্রতিপন্ন ও মানহানি করার উদ্দেশ্যে অশ্লীল ভাষায় বিভিন্ন স্ট্যাটাস ও অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।২৩ আগষ্ট কোটচাদপুর দোড়া ইউনিয়নের মল্লিকপুর গ্রামের জমি নিয়ে বেরোধ হলে ভাতিজা শাকিল চাচা তবিবার হোসেন কে কুপিয়ে হত্যা করে।কালীগঞ্জ কাশিপুর ক্লাব মোড়ে মাদক সেবন করে অসংলগ্ন পরিবেশ সুষ্টি করায় মেহেদি হাছান কে পুলিশ আটক করে।১৫ আগষ্ট বিষয়খালি থেকে রমজান আলীর গলিত লাশ উদ্ধান।২৬ জুলাই মহেশপুর ভবনগর খাল থেকে বৃদ্ধ আবুল হোসেনের লাশ উদ্ধার। ৯ জুলাই থেকে ১১ জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন গ্রামে কৃষকের ৫ গরু চুরি।২০ জুন থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত কৃষকের ১০ গরু চুরি।
এছাড়া নিরবিচ্ছন্ন ঘটনায় নিহত হয়েছেন আর ও ৩ জন। আহত হয়েছেন অন্তত ৬ জন। চুরি, ধর্ষণচেষ্টা ও কথিত যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলে জেলার বিভিন্ন এলাকায় পৃথক এসব গণপিটুনির ঘটনা ঘটে। গত এক বছরে ঝিনাইদহ জেলায় ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা ঘটেছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত ঝিনাইদহ জেলায় ৬টি গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। তন্মধ্যে ঝিনাইদহ ঝিনুকমালা আবাসন, সদর হাসপাতাল ও কালীগঞ্জ উপজেলার বাদুরগাছা গ্রামে গরু চুরির অভিযোগে গণপিটুনির ঘটনা ঘটে। পৃথক এসব ঘটনায় তিন জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ৬ জন।এসব ঘটনায় গণপিটুনিতে নিহতের পরিবার মামলা দায়ের করলে ও গ্রেফতার হয়নি হয়নি অজ্ঞাত আসামিরা। এখন পর্যন্ত পৃথক এসব ঘটনায় ঝিনাইদহ সদর থানায় তিনটি ও কালীগঞ্জ থানায় তিনটি মামলা হয়েছে। সবগুলো মামলা এখনো তদন্তাধীন রয়েছে। গ্রেফতার হয়েছেন মাত্র একজন আসামি।
২০২৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে চুরির অপবাদে সুজন মিয়া (২৮) নামে এক ব্যক্তিকে গণপিটুনি দিলে পরদিন ১৯ সেপ্টেম্বর হাসপাতালে চিকিতসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যায়।তিনি ঝিনাইদহে বসবাস করতেন এবং সুজন মিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় তার বাবা বাদী হয়ে ঝিনাইদহ সদর থানায় অজ্ঞাত ৪-৫ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় এক আসামিকে গ্রেফতার করে পুলিশ।এদিকে ২০২৬ সালের ৪ জুন দুপুরে ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজের সামনে ঝিনুকমালা আবাসন প্রকল্পে এক শিশুকে শ্লীলতাহানি চেষ্টার অভিযোগে রিকশাচালক বিল্লাল হোসেন পিটিয়ে আহত করে হাসপাতালে ভর্তির পর সে মারা যায়।নিহত বিল্লাল হোসেন মাগুরা জেলার মোহাম্মদপুর থানার বাসিন্দা ছিলেন।ওই ঘটনায় নিহতের স্বজন ও ভুক্তভোগী শিশুর পরিবার থেকে পাল্টাপাল্টি দুটি মামলা হয়েছে। ওই মামলায় এখন পর্যন্ত কোনো আসামি গ্রেফতার হয়নি।
২০২৬ সালের ২২ আগস্ট ভোরে গরু চুরির অভিযোগে কালীগঞ্জ উপজেলার বাদুরগাছা গ্রামে যশোর ও নাটোর জেলার দুই ব্যক্তিকে গাছে ঝুলিয়ে গণপিটুনি দেয় স্থানীয় গ্রামবাসী। এতে ঘটনাস্থলেই আয়নাল নামের এক ব্যক্তির মারা যান। ঘটনায় সুমন হোসেন নামে অপর ব্যক্তি আহত হন। নিহত আয়নালের বাড়ি নাটোর জেলার বনকুড়ি গ্রামে। আহত সুমন হোসেন যশোর জেলা সদরের আরাপপুর এলাকার বাসিন্দা।এ ঘটনায় কালীগঞ্জ উপজেলার বাদুড়গাছা গ্রামের নিলুফা বেগম বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে কালীগঞ্জ থানায় একটি মামলা করেছেন। একই ঘটনায় গণপিটুনিতে আহত সুমনের বড় ভাই জাহাঙ্গীর হোসেন বাদী হয়ে কালীগঞ্জ থানায় অজ্ঞাত দুইশ থেকে তিনশ জনকে আসামি করে একটি মামলা করেছেন। পৃথক এ দুটি মামলায় এখনো কাউকে আইনের আওতায় আনতে পারেনি পুলিশ।এছাড়া ২০২৬ সালের ১১ জুলাই মোবাইল চুরির অপবাদে সদর ডাকবাংলা বাজারে ১৪ বছরের এক শিশুকে রশি দিয়ে হাত পা বেঁধে গণপিটুনি দেয় স্থানীয়রা। ওই ঘটনার কয়েকদিন আগে পরকীয়ার অভিযোগ তুলে সদর উপজেলার লৌহজং এলাকায় এক বৃদ্ধ ও এক বৃদ্ধাকে রশি দিয়ে বেঁধে গণপিটুনি দেওয়ার ঘটনা ঘটে। তবে এসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত থানায় কেউ অভিযোগ করেনি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
অপরদিকে ২০২৬ সালের ১৮ আগস্ট সকালে কালীগঞ্জ উপজেলার বড়-বায়শা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুলের সহকারী শিক্ষক শাহ আলমকে স্কুলের এক শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলে অফিস কক্ষে গণপিটুনি দেয় স্থানীয় চিহ্নিত কয়েকজন। এতে শিক্ষক শাহ আলম গুরুতর আহত হন। পরে ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে ওই শিক্ষার্থীর মা বাদী হয়ে মামলা করেন। সেই রাতেই পুলিশ শিক্ষক শাহ আলমকে গ্রেফতার করে ঝিনাইদহ জেলহাজতে পাঠান।কিন্তু শিক্ষকের পরিবারের অভিযোগ, স্কুলের পুকুর ইজারার টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে স্থানীয় সাবেক ইউপি মেম্বারের যোগসাজশে ওই শিক্ষককে ফাঁসানো হয়েছে।
গণপিটুনির সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি ও গ্রেফতারের দাবিতে মানববন্ধনও করেছে প্রাথমিকশিক্ষক সমিতি। কালীগঞ্জের বাদুরগাছা গ্রামের গণপিটুনিতে আহত সুমনের বড় ভাই ও মামলার বাদী জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘আমার ভাই গত ৮ বছর ধরে মানসিক ভারসাম্যহীন। সে শুক্রবার সকালে হারিয়ে যায়। পরদিন সকালে শুনি তাকে গ্রামের মানুষ গণপিটুনি দিয়েছে। একজন মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষ কীভাবে এরকম চুরি করতে পারে আমি ভেবে পাচ্ছি না।